بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
ইয়াসীন।
শপথ প্রজ্ঞাময় কুরআনের।
নিশ্চয়ই তুমি প্রেরিত রাসূলগণের অন্যতম।
সরল পথের উপর প্রতিষ্ঠিত।
কুরআন মহা পরাক্রান্ত ও পরম দয়ালু আল্লাহ্র পক্ষ হ’তে অবতীর্ণ।
যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পূর্বপুরুষগণকে সতর্ক করা হয়নি। ফলে তারা উদাসীন।
বস্ত্তত তাদের অধিকাংশের উপর শাস্তি নির্ধারিত হয়ে গেছে। সুতরাং তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না।
আমরা তাদের গলায় বেড়ী পরিয়েছি যা পৌঁছে গেছে থুৎনী পর্যন্ত। ফলে তারা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে গেছে।
আর আমরা তাদের সামনে ও পিছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি। অতঃপর তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছি। ফলে তারা দেখতে পায় না।
তুমি তাদেরকে সতর্ক কর বা না কর, তাদের জন্য দু’টিই সমান। তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না।
তুমি কেবল তাকেই সতর্ক করতে পার, যে উপদেশ মেনে চলে এবং দয়াময় আল্লাহকে না দেখে ভয় করে। অতএব তুমি তাদেরকে (আল্লাহ্র) ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের সুসংবাদ দাও।
আমরাই মৃতদের জীবিত করি এবং লিখে রাখি যা তারা অগ্রে প্রেরণ করে ও যা তারা পিছনে ছেড়ে যায়। আর প্রত্যেক বস্ত্ত আমরা স্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ রেখেছি।
তুমি তাদের কাছে একটি জনপদের লোকদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর, যখন তাদের নিকট রাসূলগণ আগমন করেছিল।
যখন আমরা তাদের নিকট দু’জন রাসূলকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তাদেরকে মিথ্যারোপ করল। তখন আমরা তাদের শক্তিশালী করলাম তৃতীয় আরেকজনের মাধ্যমে। অতঃপর তারা বলল, আমরা তোমাদের নিকট প্রেরিত হয়েছি।
তারা বলল, তোমরা তো আমাদেরই মত মানুষ। দয়াময় (আল্লাহ) কিছুই নাযিল করেননি। তোমরা কেবলই মিথ্যা বলছ।
তারা বলল, আমাদের প্রতিপালক জানেন যে, আমরা অবশ্যই তোমাদের নিকট প্রেরিত রাসূল।
আর আমাদের উপর কোন দায়িত্ব নেই কেবল স্পষ্টভাবে আল্লাহ্র বাণী পৌঁছে দেওয়া ব্যতীত।
তারা বলল, আমরা তোমাদেরকে অমঙ্গলের কারণ মনে করি। যদি তোমরা বিরত না হও, তাহ’লে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করব এবং অবশ্যই আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি স্পর্শ করবে।
রাসূলগণ বলল, তোমাদের অমঙ্গল তোমাদের সাথেই। তোমরা কি উপদেশ প্রাপ্ত হয়েছ? বরং তোমরা হ’লে সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।
এ সময় নগরীর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি ছুটে এসে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা রাসূলদের অনুসরণ কর।
অনুসরণ কর তাদের, যারা তোমাদের কাছে কোনরূপ প্রতিদান চান না এবং তারা সুপথপ্রাপ্ত।
আর আমার কি যুক্তি আছে যে, আমি সেই সত্তার ইবাদত করব না, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে?
আমি কি তার পরিবর্তে অন্যদের উপাস্যরূপে গ্রহণ করব? যদি দয়াময় (আল্লাহ) আমাকে কোন কষ্টে ফেলতে চান, তাহ’লে তাদের সুফারিশ আমার কোনই কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে রক্ষাও করতে পারবে না।
এটা করলে আমি অবশ্যই তখন স্পষ্ট ভ্রান্তিতে পতিত হব।
আমি নিশ্চিতভাবেই তোমাদের প্রতিপালকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি। তোমরা আমার একথা ভালভাবে শুনে রাখ।
তাকে বলা হ’ল, তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর। সে বলল, হায়! যদি আমার সম্প্রদায় এটা জানত।
আমার প্রতিপালক আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিতদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
(আল্লাহ বলেন,) তার মৃত্যুর পর আমরা তার সম্প্রদায়ের উপর আসমান থেকে কোন বাহিনী প্রেরণ করিনি, আর আমরা প্রেরণকারীও ছিলাম না।
বরং সেটা ছিল একটি মাত্র নিনাদ। তাতেই তারা সব স্তব্ধ হয়ে গেল।
হায় আফসোস বান্দাদের জন্য! তাদের নিকট এমন কোন রাসূল আসেননি, যাকে তারা উপহাস করেনি।
তারা কি দেখেনা যে, তাদের পূর্বের কত সম্প্রদায়কে আমরা ধ্বংস করেছি? যারা আর কখনো তাদের কাছে ফিরে আসবে না।
আর অবশ্যই তাদের সবাইকে আমাদের নিকটে উপস্থিত করা হবে।
আর তাদের জন্য অন্যতম নিদর্শন হ’ল মৃত যমীন। যাকে আমরা জীবিত করি ও সেখান থেকে শস্য উৎপাদন করি। অতঃপর তারা তা থেকে ভক্ষণ করে।
আর তাতে আমরা সৃষ্টি করি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান সমূহ এবং তাতে প্রবাহিত করি নদী সমূহ।
যাতে তারা তার ফল থেকে ভক্ষণ করতে পারে। অথচ তাদের হাত এটি সৃষ্টি করেনি। তবুও কি তারা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করবে না?
মহা পবিত্র তিনি, যিনি সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়, ভূমি থেকে উদ্গত উদ্ভিদজগতকে ও মনুষ্যকুলকে এবং তাদের অজানা সবকিছুকে।
আর তাদের জন্য একটি নিদর্শন হ’ল রাত্রিকাল। তা থেকে আমরা দিবসকে সরিয়ে নেই। তখন তারা অন্ধকারে ডুবে যায়।
আর (অন্যতম নিদর্শন হ’ল) সূর্য। যা তার গন্তব্যের দিকে ধাবিত হয়। এটা হ’ল মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়ের নির্ধারণ।
আরেকটি (নিদর্শন হ’ল) চন্দ্র। তার জন্য আমরা কক্ষপথ সমূহ নির্ধারণ করেছি। অবশেষে তা পুরাতন খেজুর কাঁদির বাঁকা ডাটার রূপ ধারণ করে।
সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া এবং রাত্রির পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা। বরং প্রতিটিই স্ব স্ব কক্ষপথে সন্তরণ করে।
আর তাদের জন্য অন্যতম নিদর্শন হ’ল আমরা তাদের বংশধরগণকে (নূহের) ভরা নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম।
এবং তাদের জন্য অনুরূপ বাহন সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আরোহণ করে।
যদি আমরা চাই, তাহ’লে সেগুলিকে ডুবিয়ে দিতে পারি। সে অবস্থায় তাদের আর্তনাদ শ্রবণের কেউ থাকবে না এবং তারা পরিত্রাণও পাবে না।
আমাদের অনুগ্রহ ব্যতীত এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত জীবন উপভোগের সুযোগ দান ব্যতীত।
আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা আগে-পিছে যেসব পাপ করছ, তা থেকে সাবধান হও, যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হ’তে পার (তখন তারা তা উপেক্ষা করে)।
বস্ত্তত যখনই তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলীর কোন একটি নিদর্শন আসে, তখনই তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
আর যখন তাদেরকে বলা হয় আল্লাহ তোমাদেরকে যে রূযী দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় কর, তখন কাফেররা মুমিনদের বলে, আমরা কি তাদের খাওয়াবো যাদেরকে আল্লাহ ইচ্ছা করলে খাওয়াতে পারেন? তোমরা তো স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছ।
আর তারা বলে, (ক্বিয়ামতের) এই ওয়াদা কবে পূরণ হবে, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক?
তারা তো কেবল একটা নিনাদের অপেক্ষায় আছে। যা তাদেরকে ধরবে পরস্পরে ঝগড়ারত অবস্থায়।
ফলে তখন তারা অছিয়ত করতেও সক্ষম হবে না এবং নিজেদের পরিবারের কাছেও ফিরতে পারবে না।
আর যখনই শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে উঠে তাদের প্রতিপালকের দিকে ছুটে যাবে।
তারা বলবে, হায় দুর্ভোগ আমাদের! কে আমাদেরকে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উঠালো? দয়াময় (আল্লাহ) তো এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ তো সত্যই বলেছিলেন।
এটা তো হবে কেবল একটি মাত্র নিনাদ। আর তখনই সবাইকে আমাদের সামনে উপস্থিত করা হবে।
আজ কারু প্রতি কোনরূপ অবিচার করা হবেনা এবং কাউকে কোন বদলা দেওয়া হবেনা কেবল (দুনিয়ায়) তোমরা যা করতে তারই প্রতিফল ব্যতীত।
নিশ্চয়ই জান্নাতবাসীগণ এদিন আনন্দে উৎফুল্ল থাকবে।
তারা ও তাদের স্ত্রীগণ ছায়াতলে সুসজ্জিত আসনে ঠেস দিয়ে বসবে।
সেখানে তাদের জন্য থাকবে ফলমূল এবং যা তারা চাইবে।
অসীম দয়ালু প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে তাদেরকে সম্ভাষণ জানানো হবে ‘সালাম’।
আর হে অপরাধীরা! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।
হে আদম সন্তান! আমি কি (নবীদের মাধ্যমে) তোমাদের নিকট উপদেশ পাঠাইনি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
আর আমারই ইবাদত কর। এটাই সরল পথ।
নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের বহু দলকে পথভ্রষ্ট করেছে। তবুও কি তোমরা বুঝবে না?
এটাই সেই জাহান্নাম। যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হ’ত।
আজ তোমরা এতে প্রবেশ করো তোমাদের অবিশ্বাসের ফল হিসাবে।
আজ আমরা তাদের মুখে মোহর মেরে দেব। আর আমাদের সাথে কথা বলবে তাদের হাত ও সাক্ষ্য দিবে তাদের পা, তাদের কৃতকর্ম বিষয়ে।
আর আমরা চাইলে তাদের দৃষ্টিশক্তি বিলুপ্ত করে দিতাম। তখন তারা পথ চলতে চাইবে। কিন্তু কিভাবে তারা পথ দেখবে?
আমরা চাইলে স্ব স্ব স্থানে তাদের আকৃতিসমূহ বিকৃত করে দিতাম। তখন তারা সামনেও যেতে পারত না, পিছনেও ফিরতে পারত না।
আর যাকে আমরা দীর্ঘ বয়স দান করি, তার দৈহিক গঠনে আমরা পরিবর্তন ঘটাই। এরপরেও কি তারা বুঝবে না?
আর আমরা তাকে (রাসূলকে) কবিতা শিক্ষা দেইনি এবং এটি তার জন্য উচিতও নয়। এটি তো কেবল উপদেশ ও স্পষ্ট কুরআন মাত্র।
যাতে সে ভয় প্রদর্শন করতে পারে জীবিতদের এবং অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে দলীল প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
তারা কি দেখে না যে, আমাদের নিজহাতে সৃষ্ট বস্ত্তসমূহের মধ্যে তাদের জন্য আমরা সৃষ্টি করেছি গবাদিপশু। অতঃপর তারা সে সবের মালিক হয়েছে।
আর আমরা সেগুলিকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি। ফলে সেগুলির মধ্য থেকে কিছু তাদের বাহন হয়েছে এবং কিছু থেকে তারা ভক্ষণ করে।
আর তাদের জন্য এসবের মধ্যে রয়েছে বহু কল্যাণ ও পানীয়। এর পরেও কি তারা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করবে না?
তারা আল্লাহ ব্যতীত বহু উপাস্য গ্রহণ করে, যাতে তারা সাহায্য প্রাপ্ত হ’তে পারে।
অথচ এরা তাদের কোনরূপ সাহায্য করতে সক্ষম নয়। বরং এগুলিকে তাদের বাহিনী রূপে (ক্বিয়ামতের দিন) উপস্থিত করা হবে (অপদস্থ করার জন্য)।
অতএব তাদের কথা যেন তোমাকে দুঃখিত না করে। আমরা জানি যা তারা গোপন করে ও যা তারা প্রকাশ করে।
মানুষ কি দেখে না যে, আমরা তাকে সৃষ্টি করেছি (পিতা-মাতার মিশ্রিত) জনন কোষ হ’তে? অতঃপর সে হয়ে পড়ল (পুনরুত্থান বিষয়ে) প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী।
আর সে আমাদের বিষয়ে নানাবিধ উপমা দেয়। অথচ নিজের সৃষ্টি বিষয়ে ভুলে যায়। সে বলে, কে হাড্ডিগুলিকে জীবিত করবে যখন তা পচে-গলে যাবে?
তুমি বল, ওগুলিকে তিনিই জীবিত করবেন, যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন। আর তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্পর্কে সুবিজ্ঞ।
যিনি তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ হ’তে আগুন সৃষ্টি করেন। অতঃপর তা থেকে তোমরা আগুন জ্বালিয়ে থাক।
যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন তিনি কি তাদের মত মানুষকে সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? হ্যাঁ। তিনিই মহা স্রষ্টা ও সর্বজ্ঞ।
যখন তিনি কিছু করতে ইচ্ছা করেন তখন তাকে কেবল বলেন, হও। অতঃপর তা হয়ে যায়।
অতএব মহা পবিত্র তিনি, যার হাতে রয়েছে সবকিছুর রাজত্ব এবং তাঁর দিকেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।