بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
আলিফ লাম র-। এই কিতাব (কুরআন), যার আয়াতসমূহকে বিধান সম্বলিত করা হয়েছে। অতঃপর প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ হ’তে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত কারু ইবাদত করো না। নিশ্চয়ই আমি তাঁর পক্ষ হ’তে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা মাত্র।
এবং এই মর্মে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তাঁর দিকে ফিরে যাও। তিনি তোমাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ দান করবেন নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত এবং প্রত্যেক সৎকর্মশীলকে তার প্রতিদান দিবেন। আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহ’লে আমি তোমাদের উপর কঠিন দিবসের শাস্তির আশংকা করছি।
আল্লাহ্র দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। আর তিনি সকল কিছুর উপরে সর্বশক্তিমান।
জেনে রাখ, তারা তাদের বক্ষসমূহকে ফিরিয়ে নেয় আল্লাহ থেকে নিজেদের মনের কথাগুলিকে লুকানোর জন্য। জেনে রাখ, যখন তারা নিজেদেরকে কাপড় দিয়ে ঢেকে নেয়, তখনও তিনি জানেন যা তারা চুপিসারে বলে ও যা প্রকাশ্যে বলে। নিশ্চয়ই তিনি মানুষের অন্তর্যামী।
আর ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল এমন কোন প্রাণী নেই যার রিযিক আল্লাহ্র যিম্মায় নেই। আর তিনি জানেন তার স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা। সবকিছুই সুস্পষ্ট কিতাবে (লওহে মাহফূযে) লিপিবদ্ধ রয়েছে।
আর তিনিই সেই সত্তা যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। এমতাবস্থায় তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে। যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন কে তোমাদের মধ্যে সুন্দরতম আমল করে। আর যদি তুমি বল, নিশ্চয়ই তোমরা মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হবে, তাহ’লে কাফেররা অবশ্যই বলবে এটা স্পষ্ট জাদু ব্যতীত কিছুই নয়।
আর আমরা যদি গণিত কিছু সময়ের জন্য তাদের থেকে শাস্তিকে মুলতবী রাখি, তাহ’লে অবশ্যই তারা বলবে, কোন্ বস্ত্ত শাস্তিকে ঠেকিয়ে রাখল? মনে রেখ যেদিন তাদের উপর শাস্তি এসে পড়বে, সেদিন তাদের থেকে তা ফিরে যাবে না। আর যা নিয়ে তারা উপহাস করছিল তা এসে তাদেরকে বেষ্টন করে ফেলবে।
আর যদি আমরা মানুষকে আমাদের রহমতের স্বাদ আস্বাদন করাই। অতঃপর তার থেকে আমরা তা ছিনিয়ে নেই, তখন সে অবশ্যই হতাশ ও অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে।
অতঃপর যদি আমরা তাকে কোন অনুগ্রহের স্বাদ আস্বাদন করাই কোন কষ্ট ভোগের পর যা তার উপর আপতিত হয়েছিল, তখন সে উৎফুল্ল ও অহংকারী হয়।
কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ধৈর্যধারণ করে ও সৎকর্ম সমূহ সম্পাদন করে। এমন লোকদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও বিরাট পুরস্কার।
অতঃপর (কাফেরদের বিশাল ষড়যন্ত্র দেখে) হয়তো তুমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ অহি-র কিছু অংশ বর্জন করতে চাইবে, আর তোমার হৃদয় সংকুচিত হবে তাদের কথায় যে, কেন তার উপর ধন-ভান্ডার নাযিল হলো না বা তার সাথে কেন ফেরেশতা আসলো না? (মনে রেখ) তুমি একজন সতর্ককারী বৈ কিছু নও। আর আল্লাহ সকল বস্ত্তর উপরে কর্মবিধায়ক।
তবে কি তারা একথা বলে যে, এটি সে নিজেই রচনা করেছে? তাহ’লে ওদের বলে দাও, বেশ তোমরাও অনুরূপ দশটি সূরা তৈরী করে আনো। আর আল্লাহ ব্যতীত যাকে পার ডাক। যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক। (চ্যালেঞ্জ-৩)
অতঃপর যদি তারা তোমাদের আহবানে সাড়া না দেয়, তাহ’লে জেনে রাখ যে এই কুরআন আল্লাহ্র ইলম থেকেই নাযিল হয়েছে। আর জেনে রাখ যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। অতএব এখন কি তোমরা আত্মসমর্পণ করবে?
যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার জাঁকজমক কামনা করে, আমরা তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের ফল দুনিয়াতেই পূর্ণভাবে দিয়ে দিব। সেখানে তাদের কোনই কমতি করা হবে না।
এরা হ’ল সেইসব লোক যাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া কিছুই নেই। দুনিয়াতে তারা যা কিছু (সৎকর্ম) করেছিল আখেরাতে তা সবটাই বরবাদ হবে এবং যা কিছু উপার্জন তারা করেছিল সবটুকুই বিনষ্ট হবে।
অতঃপর যে ব্যক্তি তার প্রভুর পক্ষ থেকে আসা সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর রয়েছে এবং যা তাঁর পক্ষ থেকে একজন সাক্ষী (জিব্রীল) পাঠ করে থাকে। আর যার পূর্বে ছিল মূসার কিতাব, যা ছিল পথ প্রদর্শক ও রহমত স্বরূপ। এমন লোকেরাই তার (মুহাম্মাদের) উপরে বিশ্বাস স্থাপন করে। কিন্তু অন্যান্য ধর্ম-সম্প্রদায়ের যে ব্যক্তি তাকে অস্বীকার করে, জাহান্নামই তার ঠিকানা। অতএব তুমি এতে সন্দেহে পতিত হয়ো না। এটি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে সত্য কিতাব। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এতে বিশ্বাস স্থাপন করে না।
আর ঐ ব্যক্তির চেয়ে বড় যালেম আর কে আছে যে আল্লাহ্র উপরে মিথ্যারোপ করে? এসব লোককে তাদের পালনকর্তার সম্মুখে পেশ করা হবে। আর তখন সাক্ষীরা বলবে, এরাই তো সেইসব লোক যারা তাদের প্রতিপালকের উপর মিথ্যারোপ করেছিল। মনে রেখ, যালেমদের উপরেই রয়েছে আল্লাহ্র অভিসম্পাৎ।
যারা অন্যদেরকে আল্লাহ্র পথ থেকে বাধা দেয় এবং সেখানে বক্রতা অনুসন্ধান করে, তারাই হ’ল পরকালকে অস্বীকারকারী।
তারা পৃথিবীতে আল্লাহকে অক্ষম করতে পারেনি এবং আল্লাহ ব্যতীত তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই। এরূপ লোকদের জন্য রয়েছে দ্বিগুণ শাস্তি। এরা না শুনতে সক্ষম ছিল, না (সত্যপথ) দেখতে পেত।
এরা সেইসব লোক যারা নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তারা যেসব মিথ্যা (উপাস্য বা অসীলা) উদ্ভাবন করেছিল, সবই (ক্বিয়ামতের দিন) তাদের থেকে হারিয়ে যাবে।
এটা সুনিশ্চিত যে, এসব লোকেরাই হবে আখেরাতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।
নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে ও সৎকর্মসমূহ সম্পাদন করে এবং তাদের পালনকর্তার প্রতি বিনীত হয়, তারাই হ’ল জান্নাতের অধিবাসী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
দু’টি দলের দৃষ্টান্ত হ’ল যেমন অন্ধ ও বধির এবং চক্ষুষ্মান ও শ্রবণকারী। উভয়ে কি তুলনায় সমান? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?
আর অবশ্যই আমরা নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। (সে তাদেরকে বলেছিল) আমি তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী।
এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারু ইবাদত করো না। আমি তোমাদের উপর এক মর্মন্তুদ দিবসের শাস্তির আশংকা করছি।
তখন তার সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসী নেতারা বলল, আমরা তো তোমাকে আমাদের মত একজন মানুষ বৈ কিছু মনে করি না। আর আমরা তো দেখছি আমাদের সম্প্রদায়ের নিম্নশ্রেণীর স্থূলবুদ্ধি লোকেরাই কেবল তোমাকে অনুসরণ করে। আর আমাদের উপর তোমাদের কোনরূপ শ্রেষ্ঠত্ব দেখিনা। বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদীই মনে করি।
সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কি মনে কর, যদি আমি আমার পালনকর্তার পক্ষ হ’তে স্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি, আর যদি তিনি আমার উপর তাঁর পক্ষ হ’তে অনুগ্রহ (নবুঅত) দান করে থাকেন, অতঃপর তা যদি তোমাদের নিকট প্রচ্ছন্ন থাকে, তাহ’লে তোমরা অনিচ্ছুক হওয়া সত্ত্বেও কি আমরা সেটা তোমাদের উপর চাপিয়ে দিতে পারি?
আর হে আমার সম্প্রদায়! এ দাওয়াতের বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কোন অর্থ-সম্পদ চাই না। আমার প্রতিদান তো কেবল আল্লাহ্র নিকটেই রয়েছে। আর আমি তো ঈমানদারগণকে তাড়িয়ে দিতে পারি না। তারা তো তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভ করবে। বরং তোমাদেরকেই আমি নির্বোধ জাতি রূপে দেখছি।
আর হে আমার জাতি! যদি আমি তাদের তাড়িয়ে দেই, তাহ’লে আল্লাহ্র পাকড়াও থেকে কে আমাকে রক্ষা করবে? তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?
আর আমি তোমাদের একথা বলিনা যে, আমার নিকট আল্লাহ্র ধনভান্ডার রয়েছে। আর আমি গায়েবের খবর জানিনা। আর আমি বলিনা যে, আমি একজন ফেরেশতা। আমি একথাও বলি না যে, তোমাদের চোখে যারা হীন, তাদেরকে আল্লাহ কোন কল্যাণ দান করবেন না। আল্লাহ ভালভাবেই জানেন তাদের অন্তরের খবর। অতএব এসব কথা বললে আমি অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
তারা বলল, হে নূহ! তুমি আমাদের সাথে বিতন্ডা করেছ এবং তা অনেক বেশী করেছ। অতএব তুমি যে শাস্তির কথা আমাদের বলছ, তা নিয়ে আস যদি তুমি সত্যবাদী হও।
সে বলল, ওটা তো আল্লাহই তোমাদের কাছে নিয়ে আসবেন যদি তিনি চান। আর তোমরা তাকে অপারগ করতে পারবে না।
আর আমি তোমাদের উপদেশ দিতে চাইলেও তা ফলপ্রসূ হবে না, যদি আল্লাহ তোমাদের পথভ্রষ্ট করতে চান। তিনিই তোমাদের পালনকর্তা এবং তাঁর কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।
তবে কি তারা একথা বলে যে, এটি সে নিজেই রচনা করেছে? বলে দাও যদি আমি সেটা করে থাকি, তাহ’লে সে অপরাধ আমার। কিন্তু তোমরা যেসব অপরাধ করে চলেছ তা থেকে আমি দায়মুক্ত।
আর নূহের প্রতি অহি করা হ’ল এই মর্মে যে, তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে, তারা ব্যতীত আর কেউ ঈমান আনবে না। অতএব তারা যা করছে, তাতে তুমি মোটেও দুঃখ করো না।
আর তুমি আমাদের চোখের সামনে ও আমাদের নির্দেশ মতে নৌকা তৈরী কর। আর যালেমদের বিষয়ে আমার কাছে কোন সুফারিশ করো না। ওদের ডুবিয়ে মারা হবেই।
অতঃপর সে নৌকা তৈরী করতে লাগল। যখন কওমের নেতারা পাশ দিয়ে যেত, তখন তারা তাকে ঠাট্টা করত। সে বলত, যদি তোমরা আমাদের উপহাস কর তবে আমরাও তোমাদের উপহাস করছি যেমন তোমরা আমাদের উপহাস করছ।
অচিরেই তোমরা জানতে পারবে লাঞ্ছনাকর শাস্তি কার উপরে আসে এবং চিরস্থায়ী শাস্তি কার উপর আপতিত হয়।
অবশেষে যখন আমাদের নির্দেশ এসে গেল এবং চুলা থেকে পানি উথলে উঠতে লাগল, তখন আমরা বললাম, সকল প্রকার জোড়ার দু’টি করে এবং তোমার পরিবারবর্গ, তবে যাদের উপর আগেই নির্দেশ অবধারিত হয়ে গেছে তারা ব্যতীত সকল ঈমানদারকে তুমি নৌকায় তুলে নাও। বস্ত্তত অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউ তার সাথে ঈমান আনেনি।
সে বলল, তোমরা নৌকায় আরোহণ কর। আল্লাহ্র নামে এর গতি ও অবস্থান। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক অতীব ক্ষমাশীল ও দয়াবান।
নৌকাটি তাদের নিয়ে চলতে লাগল পর্বতসম ঢেউয়ের মধ্যে। এ সময় নূহ তার পুত্রকে ডেকে বলল, সে তখন দূরে ছিল, হে আমার পুত্র! তুমি আমাদের সাথে নৌকায় ওঠ এবং অবিশ্বাসীদের সঙ্গে থেকো না।
সে বলল, আমি এখুনি কোন পাহাড়ে আশ্রয় নেব যা আমাকে পানি থেকে রক্ষা করবে। সে বলল, আল্লাহ্র শাস্তি থেকে আজ বাঁচাবার কেউ নেই কেবল যাকে তিনি দয়া করবেন, সে ব্যতীত। অতঃপর তাদের উভয়ের মধ্যে একটা ঢেউ আড়াল করল। ফলে সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।
আর নির্দেশ দেওয়া হ’ল, হে পৃথিবী! তোমার পানি শোষণ করে ফেল, আর হে আকাশ! বর্ষণ থামাও। অতঃপর পানি নেমে গেল এবং ঘটনা সমাপ্ত হ’ল। আর নৌকাটি জূদী পাহাড়ে এসে ভিড়ল। আর বলা হ’ল যালেম সম্প্রদায় নিপাত যাক!
নূহ তার পালনকর্তাকে ডেকে বলল, হে আমার প্রতিপালক আমার পুত্র তো আমার পরিবারভুক্ত। আর তোমার ওয়াদা সত্য এবং তুমিই শ্রেষ্ঠ বিচারক।
আল্লাহ বললেন, হে নূহ! ওটি তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে একজন অসৎ কর্মপরায়ণ। অতএব তুমি আমার কাছে এমন বিষয়ে আবেদন করো না যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন বিষয়ে আবেদন করা থেকে, যে বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। এক্ষণে যদি তুমি আমাকে ক্ষমা না কর এবং আমার প্রতি দয়া না কর, তাহ’লে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
বলা হ’ল, হে নূহ! অবতরণ কর আমাদের পক্ষ হ’তে শান্তি ও সমৃদ্ধি সহ তোমার উপর ও তোমার সাথী দলগুলির উপর। বস্ত্তত ভবিষ্যতে অনেক দল হবে যাদেরকে আমরা (দুনিয়ায়) সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করব। অতঃপর তাদেরকে আমাদের পক্ষ হ’তে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি স্পর্শ করবে।
এটি অদৃশ্য সংবাদ সমূহের অন্তর্ভুক্ত যা আমরা তোমার নিকট অহি করলাম। ইতিপূর্বে এসব বিষয় না তুমি জানতে, না তোমার সম্প্রদায় জানত। অতএব তুমি ধৈর্যধারণ কর। নিশ্চয়ই শুভ পরিণাম কেবল আল্লাহভীরুদের জন্যই।
আর আমরা ‘আদ জাতির নিকট তাদের ভাই হূদকে প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদেরকে বলল, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন উপাস্য নেই। তোমরা তো কেবল মিথ্যা উদ্ভাবনকারী।
হে আমার জাতি! আমি তোমাদের কাছে এর কোন বিনিময় চাই না। এর বিনিময় তো কেবল তার কাছেই রয়েছে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তবুও কি তোমরা বুঝবে না?
আর হে আমার জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে এস (তওবা কর)। তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বারিধারা বর্ষণ করবেন এবং তোমাদেরকে শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করে দিবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।
তারা বলল, হে হূদ! তুমি তো আমাদের কাছে কোন প্রমাণ নিয়ে আসোনি। তাই আমরা কেবল তোমার মুখের কথায় আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করব না এবং তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী হব না।
বরং আমরা তো কেবল এটাই বলব যে, আমাদের কোন উপাস্য তোমার উপর অশুভ আছর করেছে। হূদ বলল, আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি আর তোমরাও সাক্ষী থাক যে, আমি তাদের থেকে মুক্ত যাদেরকে তোমরা শরীক সাব্যস্ত করেছ-
তাকে ছেড়ে। অতএব তোমরা সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কর। আর আমাকে কোনরূপ অবকাশ দিয়ো না।
আমি আল্লাহ্র উপর ভরসা করি, যিনি আমার ও তোমাদের প্রতিপালক। ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল এমন কোন প্রাণী নেই, যার ঝুঁটি তাঁর মুষ্ঠিতে আবদ্ধ নেই (অর্থাৎ সবকিছু তাঁর আয়ত্ত্বাধীন)। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক সরল পথে আছেন (অর্থাৎ তাঁর সকল ব্যবস্থাপনা নিখুঁত)।
এক্ষণে যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমাকে যে পয়গাম নিয়ে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে আমি তো ওটা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। আর আমার প্রতিপালক অন্য সম্প্রদায়কে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। তোমরা তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক সকল বস্ত্তর উপর তত্ত্বাবধায়ক।
আর যখন আমাদের শাস্তি পৌঁছে গেল, তখন আমরা হূদ ও তার সাথী ঈমানদারগণকে স্বীয় অনুগ্রহে উদ্ধার করলাম এবং আমরা তাদেরকে কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করলাম।
এরা ছিল ‘আদ সম্প্রদায়। যারা তাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল এবং তাঁর রাসূলগণের অবাধ্যতা করেছিল। আর তারা উদ্ধত ও হঠকারীদের কথামত চলেছিল।
এ দুনিয়ায় লা‘নত তাদের সাথী হয়ে রইল এবং তা থাকবে ক্বিয়ামতের দিনেও। মনে রেখ ‘আদ সম্প্রদায় তাদের প্রতিপালকের সাথে কুফরী করেছিল। সাবধান, হূদের কওম ‘আদ সম্প্রদায়ের জন্য ধ্বংস!
আর আমরা ছামূদ জাতির নিকট তাদের ভাই ছালেহকে প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের বলল, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন উপাস্য নেই। তিনিই তোমাদেরকে যমীন (মাটি) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে সেখানে আবাদ করেছেন। অতএব তোমরা তাঁর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকেই ফিরে চল (তওবা কর)। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক নিকটবর্তী ও দো‘আ কবুলকারী।
তারা বলল, হে ছালেহ! ইতিপূর্বে তুমি আমাদের মধ্যে একজন আকাংখিত ব্যক্তি ছিলে। তুমি কি আমাদের ঐসব বস্ত্তর পূজা থেকে নিষেধ করছ, যে সবের পূজা আমাদের বাপ-দাদারা করত? আর যেদিকে তুমি আমাদের আহবান করছ সে ব্যাপারে আমরা বড় ধরনের সন্দেহের মধ্যে রয়েছি।
সে বলল, হে আমার জাতি! তোমাদের ধারণা কি, যদি আমি আমার প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে কোন প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি তাঁর পক্ষ থেকে আমাকে কোন অনুগ্রহ (নবুঅত) প্রদান করে থাকেন, অতঃপর আমি যদি তাঁর অবাধ্যতা করি, তাহ’লে কে আমাকে আল্লাহ্র পাকড়াও থেকে রক্ষা করবে? এমতাবস্থায় তোমরা আমার ক্ষতি ছাড়া কিছুই বৃদ্ধি করবে না।
হে আমার সম্প্রদায়! এটি আল্লাহ্র উষ্ট্রী, যা তোমাদের জন্য নিদর্শন। অতএব তোমরা একে আল্লাহ্র যমীনে চরে খাবার জন্য ছেড়ে দাও। আর একে মন্দ উদ্দেশ্যে স্পর্শ করো না। তাহ’লে দ্রুত তোমাদের শাস্তি গ্রাস করবে।
অতঃপর তারা উষ্ট্রীটির পা কেটে ফেলল। তখন ছালেহ তাদের বলল, বেশ, তোমরা তোমাদের গৃহে তিনদিন জীবন ভোগ করে নাও। এটি এমন ওয়াদা যার কোন ব্যতিক্রম হবে না।
অতঃপর যখন আমাদের নির্দেশ এসে গেল, তখন আমরা স্বীয় অনুগ্রহে ছালেহ ও তার সাথী ঈমানদারগণকে উদ্ধার করলাম এবং সেদিনের লাঞ্ছনা হ’তে বাঁচিয়ে দিলাম। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালকই সর্বশক্তিমান ও মহাপরাক্রান্ত।
অতঃপর ভয়ংকর এক নিনাদ যালেমদের পাকড়াও করল। ফলে তারা তাদের গৃহে উপুড় হয়ে মরে পড়ে রইল।
যেন তারা সেখানে কখনোই বসবাস করেনি। মনে রেখ, ছামূদ জাতি তাদের প্রতিপালকের সাথে কুফরী করেছিল। সাবধান, ছামূদ জাতির জন্য ধ্বংস!
আর আমাদের দূতেরা ইব্রাহীমের নিকট সুসংবাদ নিয়ে আগমন করে ও তাকে বলে ‘সালাম’। সেও উত্তরে বলে ‘সালাম’। অতঃপর অল্পক্ষণের মধ্যেই সে তাদের সামনে একটা ভুনা বাছুর নিয়ে উপস্থিত হ’ল।
কিন্তু যখন সে দেখল যে, তাদের হাত উক্ত খাদ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেনা, তখন সে তাদের ব্যাপারটিকে অদ্ভূত মনে করল এবং তাদের থেকে মনে মনে ভীত হ’ল। তখন তারা বলল ভয় পাবেন না, আমরা লূত-এর সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছি।
তার স্ত্রী যে (অনতিদূরে) দাঁড়িয়েছিল, সে (একথা শুনে) হাসল। তখন আমরা (দূতের মাধ্যমে) তাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরে ইয়াকূবের জন্মের সুসংবাদ দিলাম।
এতে সে (খুশীতে) বলে উঠল, হায় পোড়া কপাল! আমি সন্তান প্রসব করব? অথচ আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামীও বৃদ্ধ। এটাতো তাজ্জব ব্যাপার!
তারা বলল, আপনি কি আল্লাহ্র ফায়ছালায় বিস্মিত হচ্ছেন? হে নবী পরিবার! আপনাদের উপর আল্লাহ্র রহমত ও বরকত রয়েছে। নিশ্চয়ই তিনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
অতঃপর যখন ইব্রাহীমের ভয় দূর হ’ল ও তার নিকট (ইসহাক জন্মের) সুসংবাদ এসে গেল, তখন সে লূতের কওমের উপর (গযব নাযিলের বিষয়ে) আমাদের (দূতগণের) সাথে ঝগড়া শুরু করে দিল।
নিঃসন্দেহে ইব্রাহীম ছিল বড়ই সহনশীল, কোমল হৃদয় ও বিনীত।
(দূতেরা বলল,) হে ইব্রাহীম! এসব কথা ছাড়ুন! আপনার প্রতিপালকের নির্দেশ এসে গেছে। আর নিশ্চয়ই তাদের উপর এমন এক শাস্তি আসছে যা অবধারিত।
অতঃপর যখন আমাদের দূতেরা লূতের নিকট উপস্থিত হ’ল, তখন তাদের দেখে তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল এবং তাদের চিন্তায় সে বিব্রত হয়ে পড়ল। আর বলল, আজকে আমার জন্য বড়ই সংকটময় দিন।
তার কওমের লোকেরা তার দিকে দৌড়ে এল, যারা পূর্ব থেকেই কুকর্মে অভ্যস্ত ছিল। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার ঐসব মেয়েরা (তোমাদের স্ত্রীরা) রয়েছে, তারাই তোমাদের জন্য পবিত্র। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে আমার মেহমানদের ব্যাপারে লজ্জিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কোন জ্ঞানী মানুষ নেই?
তারা বলল, তুমি তো জানো তোমার এইসব মেয়েদের কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। তুমি তো ভালভাবেই জানো আমরা কি চাই।
সে বলল, হায়! যদি তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন শক্তি থাকত অথবা আমি যদি কোন দৃঢ় স্তম্ভের আশ্রয় পেতাম!
দূতেরা বলল, হে লূত! আমরা আপনার পালনকর্তার প্রেরিত দূত। ওরা কখনোই আপনার নিকটে পৌঁছতে পারবে না। আপনি কিছু রাত থাকতেই আপনার ঈমানদার সাথীদের নিয়ে বেরিয়ে যান। এ সময় আপনাদের কেউ যেন পিছন ফিরে না তাকায়। তবে আপনার স্ত্রী ব্যতীত। কেননা তাকে ঐ গযব পাকড়াও করবে যা অন্যদের করবে। নিশ্চয়ই ওদের মেয়াদ হ’ল প্রভাত পর্যন্ত। আর প্রভাত কি নিকটবর্তী নয়?
অতঃপর যখন আমাদের নির্দেশ এসে গেল, তখন আমরা ঐ ভূখন্ডের উপরিভাগকে নীচের ভাগে উল্টে দিলাম এবং তার উপরে একাধারে মেটেল পাথর নিক্ষেপ করতে থাকলাম।
যার প্রতিটি তোমার প্রতিপালকের নিকট বিশেষভাবে চিহ্নিত ছিল। আর ঐ ধ্বংসস্থলটি (মক্কার) যালেমদের থেকে বেশী দূরে নয়।
আর আমরা মাদিয়ানবাসীদের প্রতি তাদের ভাই শো‘আয়েবকে পাঠিয়েছিলাম। সে তাদের বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। আর তোমরা মাপে ও ওযনে কম দিয়ো না। আমি তোমাদেরকে সচ্ছল অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি। অথচ আমি তোমাদের উপর এক বেষ্টনকারী দিবসের শাস্তির আশংকা করছি।
হে আমার জাতি! তোমরা ন্যায্যভাবে মাপ ও ওযন পূর্ণ কর এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্ত্ততে কম দিয়ো না। আর জনপদে অশান্তি সৃষ্টিকারী হিসাবে ঘুরে বেড়িয়ো না।
আল্লাহ প্রদত্ত রূযীই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। আর আমি তো তোমাদের উপর পাহারাদার নই।
তারা বলল, হে শো‘আয়েব! তোমার ছালাত কি তোমাকে এই শিক্ষা দেয় যে, আমরা ঐসবের পূজা ছেড়ে দেই, আমাদের বাপ-দাদারা যাদের পূজা করত? অথবা আমাদের ধন-সম্পদে আমরা ইচ্ছামত যা কিছু করে থাকি, তা পরিত্যাগ করি? নিশ্চয়ই তুমি তো একজন সহনশীল ও সজ্জন ব্যক্তি।
সে বলল, হে আমার জাতি! তোমরা কি মনে কর, যদি আমি আমার প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর পক্ষ হ’তে উত্তম রিযিক (নবুঅত) দান করেন? আর আমি চাই না যে, যা থেকে আমি তোমাদের নিষেধ করি, আমি তার বিপরীত করি। বরং আমি আমার সাধ্যমত তোমাদের সংশোধন চাই মাত্র। আর আমার কোনই ক্ষমতা নেই আল্লাহ্র সাহায্য ব্যতীত। আমি তাঁর উপরেই ভরসা করি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই।
হে আমার জাতি! আমার উপরে হঠকারিতা করে তোমরা নিজেদের উপর নূহ, হূদ বা ছালেহ-এর কওমের মত আযাব ডেকে এনো না। আর লূতের কওমের (ধ্বংসের) ঘটনা তো তোমাদের থেকে দূরে নয়।
আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তাঁর দিকেই ফিরে যাও। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক অতীব দয়ালু ও প্রেমময়।
তারা বলল, হে শো‘আয়েব! তোমার অত শত কথা আমরা বুঝি না। তোমাকে তো আমাদের মধ্যকার একজন দুর্বল ব্যক্তি বলে আমরা মনে করি। যদি তোমার গোষ্ঠীর লোকেরা না থাকত, তাহ’লে আমরা তোমাকে পাথর মেরে মাথা ফাটিয়ে দিতাম। তুমি আমাদের উপর মোটেই পরাক্রমশালী নও।
সে বলল, হে আমার জাতি! আমার গোত্রই কি তোমাদের নিকট বড় হয়ে গেল আল্লাহ্র চাইতে? অথচ তাঁকে তোমরা পিছনে ফেলে রেখেছ? নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক তোমাদের সকল কার্যকলাপ বেষ্টন করে আছেন।
অতএব হে আমার জাতি! তোমরা তোমাদের স্থানে কাজ কর, আমিও কাজ করে যাই। অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কার উপরে লজ্জাকর শাস্তি নেমে আসে এবং কে মিথ্যাবাদী। তোমরা অপেক্ষায় থাকো, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় রইলাম।
অতঃপর যখন আমাদের নির্দেশ এসে গেল, তখন আমরা শো‘আয়েব ও তার ঈমানদার সাথীদের নিজ অনুগ্রহে রক্ষা করলাম। আর একটি বিকট নিনাদ পাপিষ্ঠদের গ্রাস করল। ফলে তারা সবাই স্ব স্ব গৃহে উপুড় হয়ে মরে পড়ে রইল।
যেন ইতিপূর্বে সেখানে তারা কেউ বসবাস করেনি। সাবধান! ছামূদ জাতির ন্যায় মাদিয়ানবাসীদের উপরেও অভিসম্পাৎ!
আর আমরা মূসাকে আমাদের নিদর্শনাবলী ও সুস্পষ্ট প্রমাণ সহ প্রেরণ করেছিলাম-
ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গের নিকটে। কিন্তু তারা ফেরাঊনের আদেশ মেনে চলতে থাকে। অথচ ফেরাঊনের আদেশ আদৌ সঙ্গত ছিল না।
ক্বিয়ামতের দিন সে তার সম্প্রদায়ের আগে আগে থাকবে ও তাদেরকে জাহান্নামে পৌঁছে দিবে। আর সেটা কতই না নিকৃষ্ট স্থান যেখানে তারা উপনীত হবে।
আর অভিসম্পাৎ তাদের পিছে পিছে থাকবে এ দুনিয়াতে এবং ক্বিয়ামতের দিনে। কতই না নিকৃষ্ট ফলাফল তারা লাভ করবে।
এগুলি হ’ল বিগত জনপদ সমূহের কিছু খবর, যা আমরা তোমাকে শুনালাম। যেগুলির মধ্যে কোন কোনটি এখনও বর্তমান আছে এবং কোন কোনটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
আমরা তাদের উপর যুলুম করিনি। বরং তারাই নিজেদের উপর যুলুম করেছিল। অথচ যখন তোমার পালনকর্তার নির্দেশ এসে গেল, তখন তাদের উপাস্যরা তাদের কোন কাজে আসেনি যাদেরকে তারা ডাকত আল্লাহকে ছেড়ে। বরং তারা তাদের জন্য ধ্বংসের মাত্রা ব্যতীত কিছুই বৃদ্ধি করেনি।
আর এরূপই হয়ে থাকে তোমার পালনকর্তার পাকড়াও, যখন তিনি কোন পাপিষ্ঠ জনপদকে পাকড়াও করেন। নিশ্চয়ই তাঁর পাকড়াও অতীব যন্ত্রণাদায়ক ও অত্যন্ত কঠোর।
এসব ঘটনায় অবশ্যই উপদেশ রয়েছে সেই ব্যক্তির জন্য যে পরকালের শাস্তিকে ভয় করে। ওটা এমন একটা দিন, যেদিন সমস্ত মানুষকে সমবেত করা হবে এবং ওটা হ’ল সকলের উপস্থিত হওয়ার দিন।
আর আমরা ওটাকে বিলম্বিত করেছি কেবল গণিত একটা মেয়াদের জন্য।
যখন সেদিনটি আসবে, তখন কোন ব্যক্তি আল্লাহ্র অনুমতি ব্যতীত কথা বলতে পারবে না। আর তাদের মধ্যে থাকবে হতভাগা ও ভাগ্যবান।
অতঃপর যারা হতভাগা হবে তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। সেখানে তাদের জন্য থাকবে কেবল চীৎকার ও আর্তনাদ।
সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, যতদিন আসমান ও যমীন বর্তমান থাকবে। তবে তোমার প্রতিপালক যদি অন্য কিছু চান। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক যা চান তা-ই করে থাকেন।
পক্ষান্তরে যারা ভাগ্যবান, তারা চিরকাল জান্নাতে থাকবে, যতদিন আসমান ও যমীন বর্তমান থাকবে। তবে তোমার প্রতিপালক যদি অন্য কিছু চান। আর এ দান হবে অফুরন্ত।
অতএব ওরা যেসবের পূজা করে, তাতে তুমি ধোঁকায় পড়ো না। ইতিপূর্বে ওদের বাপ-দাদারা যেরূপ পূজা করত, এরাও সেরূপ করছে। আর আমরা অবশ্যই তাদের প্রাপ্য শাস্তির অংশ পুরোপুরি দিয়ে দেব কোনরূপ কমতি ছাড়াই।
আর আমরা মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে মতভেদ করা হ’ল। যদি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একটি বিষয় পূর্ব নির্ধারিত না থাকত, তাহ’লে ওদের চূড়ান্ত ফায়ছালা হয়ে যেত। বস্ত্তত এই লোকেরা আল্লাহ্র কিতাবের ব্যাপারে সন্দেহ ও দ্বন্দ্বের মাঝে পতিত রয়েছে।
আর নিশ্চিতরূপে তোমার প্রতিপালক সকলকে তাদের কাজের পূর্ণ প্রতিদান দিবেন। নিশ্চয়ই তিনি তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবহিত।
অতএব তুমি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছ সেভাবে দৃঢ় থাক এবং তোমার সাথে যারা (শিরক ও কুফরী থেকে) তওবা করেছে তারাও। আর তোমরা সীমালংঘন করো না। নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের সকল কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করেন।
আর তোমরা যালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না। তাহ’লে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে। বস্ত্তত আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোন বন্ধু নেই। অতঃপর তোমরা কোনরূপ সাহায্য প্রাপ্ত হবে না।
আর তুমি ছালাত কায়েম কর দিনের দুই প্রান্তে ও রাত্রির কিছু অংশে। নিশ্চয়ই সৎকর্মসমূহ মন্দ কর্মসমূহকে বিদূরিত করে। আর এটি (কুরআন) হ’ল উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য (সর্বোত্তম) উপদেশ।
আর তুমি ধৈর্যধারণ কর। কেননা আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।
অতএব তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগুলির মধ্যে এমন দূরদর্শী লোক কেন হ’ল না, যারা জনপদে বিপর্যয় সৃষ্টিতে বাধা দিত? তবে অল্প কিছু লোক ব্যতীত, যাদেরকে আমরা তাদের মধ্য হ’তে (আযাব থেকে) রক্ষা করেছিলাম। অথচ যালেমরা তো ভোগ-বিলাসের পিছনে পড়ে ছিল। আর তারা ছিল পাপী।
আর তোমার প্রতিপালক এমন নন যে, সেখানকার অধিবাসীরা সৎকর্মশীল হওয়া সত্ত্বেও জনপদ সমূহকে তিনি যুলুম বশে ধ্বংস করে দিবেন।
বস্ত্তত যদি তোমার প্রতিপালক চাইতেন, তবে সকল মানুষকে একই দলভুক্ত করে দিতেন। কিন্তু তারা সর্বদা মতভেদ করতেই থাকবে।
কেবল তারা ব্যতীত যাদের উপর তোমার প্রতিপালক অনুগ্রহ করেন। আর এজন্যেই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। এভাবে তোমার প্রভুর বাণী পূর্ণতা লাভ করবে যে, অবশ্যই আমি জাহান্নাম পূর্ণ করব জিন ও ইনসান সবাইকে দিয়ে।
বস্ত্তত বিগত রাসূলগণের বৃত্তান্ত সমূহ থেকে আমরা তোমার নিকট বিবৃত করলাম। যার দ্বারা তোমার চিত্তকে আমরা অবিচল রাখতে চাই। এর মাধ্যমে তোমার নিকট এসে গেছে সত্য এবং বিশ্বাসীদের নিকট উপদেশ ও শিক্ষণীয় বাণী সমূহ।
আর তুমি অবিশ্বাসীদের বলে দাও, তোমরা তোমাদের স্থানে কাজ করতে থাক, আমরাও কাজ করতে থাকি।
আর তোমরা অপেক্ষা করতে থাক, আমরাও অপেক্ষায় থাকি।
বস্ত্তত নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের অদৃশ্য জ্ঞান সমূহ কেবল আল্লাহ্র নিকটেই রয়েছে এবং তাঁর দিকেই সবকিছু প্রত্যাবর্তিত হবে। অতএব তুমি তাঁর ইবাদত কর ও তাঁর উপরেই ভরসা কর। আর তোমরা যা কিছু কর, তোমার প্রতিপালক সেসব বিষয়ে উদাসীন নন।