بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
মহাপবিত্র তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আক্বছা পর্যন্ত, যার চতুস্পার্শ্বকে আমরা বরকতমন্ডিত করেছি, তাকে আমাদের নিদর্শনসমূহ দেখাবার জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।
আর আমরা মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম এবং সেটিকে বনু ইস্রাঈলের জন্য পথ প্রদর্শক করেছিলাম। যাতে তারা আমাকে ছেড়ে অন্যকে কর্মবিধায়ক হিসাবে গ্রহণ না করে।
(হে মানবজাতি!) তোমরা তো তাদের সন্তান, যাদেরকে আমরা নূহের সাথে (নৌকায়) আরোহণ করিয়েছিলাম। নিশ্চয়ই সে ছিল একজন কৃতজ্ঞ বান্দা।
আর আমরা কিতাবে ফায়ছালা করে রেখেছিলাম যে, তোমরা জনপদে (শামে) দু’বার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমরা অত্যন্ত বড় ধরনের বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হবে।
অতঃপর যখন প্রতিশ্রুত সেই প্রথম সময়টি এল, তখন আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে আমাদের একদল বান্দাকে প্রেরণ করলাম, যারা ছিল কঠোর যোদ্ধা। অতঃপর তারা জনপদের ঘরে-ঘরে ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালালো। আর এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হওয়ারই ছিল।
অতঃপর আমরা তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের পালা ঘুরিয়ে দিলাম এবং তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করলাম। আর তোমাদেরকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত করলাম।
তোমরা সৎকর্ম করলে নিজেদের জন্যেই সেটা করবে। আর মন্দকর্ম করলে সেটাও নিজেদের জন্য। অতঃপর যখন প্রতিশ্রুত দ্বিতীয় সময়টি এসে গেল, (তখন আমরা অন্য বান্দাদের প্রেরণ করলাম) যাতে তারা তোমাদের মুখমন্ডল কালিমালিপ্ত করে দেয় এবং যাতে তারা মসজিদে (বায়তুল মুক্বাদ্দাসে) প্রবেশ করে। যেমন তারা সেখানে প্রথমবার প্রবেশ করেছিল এবং যেখানেই তারা জয়ী হবে সেখানেই যাতে পুরোপুরি ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
অবশ্যই তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। কিন্তু যদি তোমরা (যুলুমের) পুনরাবৃত্তি কর, তাহ’লে আমরাও (শাস্তির) পুনরাবৃত্তি করব। আর জাহান্নামকে আমরা অবিশ্বাসীদের জন্য কারাগার স্বরূপ বানিয়েছি।
নিশ্চয় এই কুরআন এমন পথের নির্দেশনা দেয় যা সবচাইতে সরল। আর তা সৎকর্মশীল মুমিনদের সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।
পক্ষান্তরে যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের জন্য আমরা প্রস্ত্তত করে রেখেছি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
আর মানুষ যেভাবে মন্দের দো‘আ করে, সেভাবেই কল্যাণের দো‘আ করে। বস্ত্তত মানুষ বড়ই দ্রুততা প্রিয়।
আমরা রাত্রি ও দিবসকে দু’টি নিদর্শন রূপে নির্ধারণ করেছি। অতঃপর রাত্রির নিদর্শনকে করেছি নিষ্প্রভ এবং দিবসের নিদর্শনকে করেছি আলোকময়। যাতে তোমরা (তাতে) তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার। আর যাতে তোমরা বছর সমূহের গণনা ও হিসাব জানতে পার। বস্ত্তত আমরা সকল বিষয় বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে দেই।
প্রত্যেক মানুষের কৃতকর্মকে আমরা তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। আর ক্বিয়ামতের দিন আমরা তাকে বের করে দেখাব একটি আমলনামা, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে।
(সেদিন আমরা বলব,) তুমি তোমার আমলনামা পাঠ কর। আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাবের জন্য যথেষ্ট।
যে ব্যক্তি সৎপথ অবলম্বন করে, সে তার নিজের কল্যাণের জন্যেই সেটা করে। আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হয়, সে তার নিজের ধ্বংসের জন্যেই সেটা হয়। বস্ত্তত একের বোঝা অন্যে বহন করবে না। আর আমরা রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেই না।
যখন আমরা কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন আমরা সেখানকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নির্দেশ দেই। তখন তারা সেখানে পাপাচারে মেতে ওঠে। ফলে তার উপর শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। অতঃপর আমরা ওটাকে পুরাপুরি বিধ্বস্ত করে দেই।
আর নূহের পরের যুগ সমূহে আমরা বহু জনপদকে ধ্বংস করেছি। বস্ত্তত তোমার পালনকর্তাই তার বান্দাদের পাপাচার সমূহের খবর জানা ও দেখার জন্য যথেষ্ট।
যে ব্যক্তি দুনিয়া কামনা করে, আমরা সেখানে যাকে চাই তাকে যতটুকু ইচ্ছা দ্রুত দিয়ে দেই। পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি। সেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত ও অনুগ্রহ বঞ্চিত অবস্থায়।
আর যে ব্যক্তি আখেরাত কামনা করে এবং সেখানে ছওয়াব লাভে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে তার জন্য যথার্থভাবে চেষ্টা করে, তাদের সেই চেষ্টা গৃহীত হয়।
ওদের এবং এদের সবাইকে আমরা তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ (রিযিক) দ্বারা সাহায্য করে থাকি। আর তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ কারু জন্য নিষিদ্ধ নয়।
তুমি দেখ, কিভাবে আমরা তাদেরকে পরস্পরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। আর (দুনিয়ার মোকাবেলায়) আখেরাত অবশ্যই মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ এবং প্রাচুর্যে শ্রেষ্ঠ।
তুমি আল্লাহ্র সাথে কাউকে উপাস্য নির্ধারণ করো না। তাহ’লে তুমি নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে পড়ে থাকবে।
আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারু উপাসনা করো না এবং তোমরা তোমাদের পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহ’লে তুমি তাদের প্রতি উহ্ শব্দটিও উচ্চারণ করো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। আর তুমি তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বল।
আর তুমি তাদের প্রতি মমতাবশে বিনয়াবনত থাক এবং বল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে তারা আমাকে শৈশবে প্রতিপালন করেছিলেন।
তোমাদের প্রতিপালক ভালভাবেই জানেন তোমাদের অন্তরে যা আছে। যদি তোমরা সৎকর্মশীল হও, তবে তিনি সর্বদা তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল।
তুমি নিকটাত্মীয়কে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর তুমি মোটেই অপচয় করো না।
নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি অকৃতজ্ঞ।
আর তোমার প্রতিপালকের দয়া প্রত্যাশী থাকা অবস্থায় যদি কখনো তাদের (অর্থাৎ অভাবগ্রস্তদের) বিমুখ করতেই হয়, তাহ’লে তুমি তাদের প্রতি নম্রভাবে কথা বলো।
তুমি তোমার হাতকে গুটিয়ে গ্রীবালগ্ন করে রেখ না এবং তাকে একেবারে মুক্ত করে দিয়ো না। তাহ’লে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।
নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক যাকে ইচ্ছা রূযী প্রশস্ত করেন ও সংকুচিত করেন। নিঃসন্দেহে তিনি তাঁর বান্দাদের সবকিছু জানেন ও দেখেন।
তোমরা দরিদ্রতার ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমরা তাদের ও তোমাদের রূযী দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।
তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।
আর আল্লাহ যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন, তোমরা তাকে হত্যা করো না ন্যায্য কারণ ব্যতীত। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, তার উত্তরাধিকারীকে আমরা অধিকার দিয়েছি। অতএব সে যেন হত্যার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করে। নিশ্চয়ই সে সাহায্য প্রাপ্ত হবে।
তোমরা ইয়াতীমের মালের নিকটবর্তী হয়ো না উত্তম পন্থায় ব্যতীত, যতদিন না সে যোগ্য বয়সে উপনীত হয়। আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে।
তোমরা মাপের সময় পূর্ণভাবে মেপে দাও এবং তুলাদন্ডে সঠিকভাবে ওযন কর। এটাই হ’ল উত্তম ও পরিণামে কল্যাণকর।
আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পিছে পড়ো না। নিশ্চয় তোমার কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় প্রতিটিই (ক্বিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হবে।
আর তুমি জনপদে দম্ভভরে বিচরণ করো না। নিশ্চয়ই তুমি ভূ-পৃষ্ঠকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছতে পারবে না।
বর্ণিত বিষয়গুলির মধ্যে যেগুলি মন্দ, সেগুলি তোমার প্রতিপালকের নিকট অপসন্দনীয়।
এগুলি হ’ল ঐ প্রজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত, যা তোমার প্রতিপালক তোমাকে অহি করেছেন। অতএব তুমি আল্লাহ্র সাথে অন্যকে উপাস্য নির্ধারণ করো না। তাহ’লে তুমি নিন্দিত ও অনুগ্রহ বঞ্চিত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদের জন্য পুত্র সন্তান নির্ধারণ করেছেন এবং নিজের জন্য ফেরেশতাদের কন্যারূপে গ্রহণ করেছেন? নিশ্চয়ই তোমরা ভয়ানক কথা বলে থাক।
আমরা এই কুরআনে বিশদভাবে বর্ণনা করেছি যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু তাতে কেবল তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়।
তুমি বল, যদি তাদের কথা মত তাঁর সাথে অন্য কোন উপাস্য থাকত, তাহ’লে তারা অবশ্যই আরশের মালিকের নৈকট্য হাছিলের পথ তালাশ করত।
তিনি (শরীক থেকে) পবিত্র এবং তারা যেসব কথা বলে সেসব থেকে বহু ঊর্ধ্বে।
সাত আসমান ও যমীন এবং এ দু’য়ের মধ্যেকার সবকিছু তাঁরই পবিত্রতা ঘোষণা করে। আর এমন কিছু নেই যা তার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করে না। কিন্তু তাদের পবিত্রতা বর্ণনা তোমরা বুঝতে পারো না। নিশ্চয়ই তিনি অতীব সহনশীল ও ক্ষমাপরায়ণ।
যখন তুমি কুরআন পাঠ কর, তখন আমরা তোমার ও যারা পরকালে বিশ্বাস করেনা তাদের মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন পর্দা ফেলে দেই।
আর আমরা তাদের অন্তরের উপর আবরণ টেনে দেই যেন তারা অনুধাবন করতে না পারে এবং তাদের কানে বধিরতা এনে দেই। যখন তুমি কুরআনে তোমার একমাত্র প্রতিপালককে স্মরণ কর, তখন তারা পিঠ ফিরে চলে যায়।
আমরা ভালভাবে জানি যখন তারা কান পেতে তোমার কথা শোনে, তখন তারা কেন তা মন দিয়ে শোনে এবং (এটাও জানি) যখন গোপনে আলোচনাকালে যালেমরা বলে, তোমরা তো এক জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির অনুসরণ করছ।
দেখ, তারা তোমার ব্যাপারে কতসব উপমা দিচ্ছে। ওরা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। অতএব ওরা আর সুপথ পেতে সক্ষম হবে না।
তারা বলে, যখন আমরা হাড়-হাড্ডি হব ও মাটি হয়ে যাব, তখনও কি আমরা নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?
বলে দাও, তোমরা পাথর হও বা লোহা হও;
অথবা এমন সৃষ্টি হও যা তোমাদের ধারণায় খুবই বড়। তখনও তারা বলবে, কে আমাদের পুনরায় সৃষ্টি করবে? বলে দাও, যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন (তিনিই পুনরায় সৃষ্টি করবেন)। এরপরেও ওরা তোমার সামনে মাথা নাড়বে আর বলবে, কবে সেটা হবে? বল, অবশ্যই সেটা নিকটবর্তী।
যেদিন তিনি তোমাদেরকে আহবান করবেন। অতঃপর তোমরা (পুনর্জন্মের খুশীতে) প্রশংসার সাথে তাঁর ডাকে সাড়া দিবে এবং ভাববে যে, স্বল্পকালই তোমরা (দুনিয়ায় বা কবরে) অবস্থান করেছিলে।
(হে নবী!) তুমি আমার বান্দাদের বল, তারা যেন (পরস্পরে) উত্তম কথা বলে। (কেননা) শয়তান সর্বদা তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।
তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের সম্পর্কে ভালভাবেই জানেন। তিনি চাইলে তোমাদের প্রতি দয়া করবেন এবং চাইলে তোমাদের শাস্তি দিবেন। আর আমরা তোমাকে তাদের উপর কর্মবিধায়ক করে পাঠাইনি।
আর তোমার প্রতিপালক ভালভাবেই জানেন যা কিছু আছে নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে। আর আমরা নবীদের কাউকে কারুর উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি এবং দাঊদকে ‘যবূর’ দান করেছি।
বল, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে উপাস্য ধারণা কর তাদেরকে আহবান কর। দেখবে তোমাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করার বা তা পরিবর্তন করার সামান্য ক্ষমতাও তারা রাখে না।
তারা যাদেরকে আহবান করে তারাই তো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, কে আল্লাহ্র অধিকতর নিকটবর্তী। তারা তাঁর অনুগ্রহ কামনা করে ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালকের শাস্তি অতীব ভয়াবহ।
এমন কোন জনপদ নেই যা আমরা ক্বিয়ামতের পূর্বে ধ্বংস করব না অথবা তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেব না। এটাই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।
পূর্ববর্তীগণ নিদর্শন সমূহে মিথ্যারোপ করার কারণেই আমাদেরকে (তোমাদের প্রতি) নিদর্শন সমূহ প্রেরণে বিরত রেখেছে। আমরা ছামূদ জাতির নিকট প্রকাশ্য নিদর্শন স্বরূপ উষ্ট্রী পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর তারা তার প্রতি অত্যাচার করেছিল। বস্ত্তত আমরা কেবল ভয় প্রদর্শনের জন্যেই নিদর্শন সমূহ প্রেরণ করে থাকি।
আর (স্মরণ কর) যখন আমরা তোমাকে বলেছিলাম যে, তোমার প্রতিপালক মানুষকে বেষ্টন করে আছেন। আর আমরা তোমাকে (মে‘রাজের রাতে) যে দৃশ্য দেখিয়েছি এবং কুরআনে বর্ণিত যে অভিশপ্ত (যাক্কুম) বৃক্ষ দেখিয়েছি, তা ছিল কেবল মানুষের (ঈমান) পরীক্ষার জন্য। আমরা তাদের ভীতি প্রদর্শন করি। অথচ এটি তাদের কিছুই বৃদ্ধি করেনি বড় ধরনের অবাধ্যতা ব্যতীত।
আর (স্মরণ কর) যখন আমরা ফেরেশতাদের বলেছিলাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর। তখন সবাই সিজদা করল ইবলীস ব্যতীত। সে বলল, আমি কি তাকে সিজদা করব যাকে আপনি মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন?
সে বলল, আপনি তো দেখছেন যে, আপনি একে আমার উপরে মর্যাদা দিয়েছেন! এক্ষণে যদি আপনি আমাকে ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দেন, তাহ’লে তার বংশধর সবাইকে আমি পথভ্রষ্ট করে ফেলব কিছু সংখ্যক ব্যতীত।
আল্লাহ বললেন, যাও (তোমাকে অবকাশ দিলাম)। অতঃপর ওদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে, নিশ্চয় জাহান্নামই হবে তোমাদের জন্য পূর্ণ ফলাফল।
আর তাদের মধ্য থেকে যাকে পার তুমি সত্যচ্যুত কর তোমার আহবান দ্বারা এবং তুমি তাদের উপর হামলা কর তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী দ্বারা। আর তুমি শরীক হয়ে যাও তাদের ধন-সম্পদে ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দাও। বস্ত্তত শয়তান তাদেরকে মিথ্যা ব্যতীত কোন প্রতিশ্রুতি দেয় না।
নিশ্চয়ই আমার (অনুগত) বান্দাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই। আর কর্মবিধায়ক হিসাবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট।
তোমাদের প্রতিপালক তিনিই, যিনি তোমাদের জন্য সমুদ্রে নৌযান পরিচালনা করেন, যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার। নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের প্রতি অসীম দয়ালু।
আর সমুদ্রে যখন তোমাদের কোন বিপদ আসে, তখন যাদেরকে তোমরা আহবান করতে, তারা হারিয়ে যায় কেবল আল্লাহ ব্যতীত। অতঃপর যখন তিনি তোমাদের উদ্ধার করে তীরে পেঁŠছে দেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। বস্ত্তত মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ।
তোমরা কি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছ যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ভূ-ভাগের কোন এক প্রান্তে ধ্বসিয়ে দিবেন না? অথবা তোমাদের উপর (বৃষ্টির সাথে) কংকর বর্ষণ করবেন না? অতঃপর তোমরা তোমাদের জন্য কোন কর্মবিধায়ক পাবে না।
অথবা তোমরা কি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছ যে, তিনি পুনরায় তোমাদেরকে সমুদ্রে নিয়ে যাবেন না। অতঃপর তোমাদের উপর সামুদ্রিক ঝড় পাঠাবেন না এবং তোমাদের কুফরীর বদলা হিসাবে তোমাদেরকে ডুবিয়ে মারবেন না? অতঃপর তোমরা এ বিষয়ে আমাদের বিরুদ্ধে কোন সাহায্যকারী পাবে না।
আর নিশ্চয়ই আমরা আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি এবং তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দিয়েছি। আর আমরা তাদেরকে পবিত্র রূযী দান করেছি এবং আমরা তাদেরকে আমাদের অনেক সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।
(স্মরণ কর) যেদিন আমরা প্রত্যেক জাতিকে তাদের আমলনামা সহ আহবান করব। অতঃপর যাদেরকে তাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে, তারা তাদের আমলনামা পাঠ করবে এবং তাদের প্রতি সামান্যতম অবিচার করা হবে না।
বস্ত্তত যে ব্যক্তি ইহকালে অন্ধ, সে পরকালেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট।
আর আমরা তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি, তা থেকে ওরা নিশ্চিতভাবে তোমাকে ফিৎনায় ফেলার উপক্রম করেছিল, যাতে তুমি আমাদের বিরুদ্ধে ওর বিপরীত কিছু উদ্ভাবন কর। আর তখন ওরা নিশ্চিতভাবে তোমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত।
যদি আমরা তোমাকে দৃঢ়চিত্ত না রাখতাম, তাহ’লে তুমি অবশ্যই তাদের প্রতি কিছুটা হ’লেও ঝুঁকে পড়তে।
আর তখন অবশ্যই আমরা তোমাকে ইহকালে ও পরকালে দ্বিগুণ শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাতাম। অতঃপর তখন তুমি তোমার জন্য আমার বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যকারী পেতে না।
আর দেশ (মক্কা) থেকে বহিষ্কারের জন্য তারা তোমাকে ঘাবড়ে দেবার উপক্রম করেছিল। সেটি হলে তোমার পরে তারা সেখানে অল্পকালই মাত্র টিকে থাকত।
আমাদের রাসূলগণের মধ্যে যাদেরকে আমরা তোমার পূর্বে প্রেরণ করেছিলাম, তাদের ক্ষেত্রেও এরূপ (শাস্তিদানের) রীতি ছিল এবং আমাদের এ নিয়মের কোন ব্যতিক্রম তুমি দেখতে পাবে না।
সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে রাত্রির অন্ধকার পর্যন্ত তুমি ছালাত কায়েম কর এবং ফজরের ছালাত আদায় কর। নিশ্চয়ই ফজরের ছালাত সাক্ষ্যপ্রাপ্ত হয়।
আর তুমি রাত্রির কিছু অংশে (শেষ রাতে) তাহাজ্জুদের ছালাত আদায় কর। এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত। অবশ্যই তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রশংসিত স্থানে উঠাবেন।
আর তুমি বল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে প্রবেশ করাও যথার্থভাবে এবং বের কর যথার্থভাবে। আর আমাকে তোমার পক্ষ হ’তে সাহায্যকারী শক্তি দাও।
আর বল, সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েই থাকে।
আর আমরা কুরআন নাযিল করেছি, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও অনুগ্রহ স্বরূপ। কিন্তু যালেমদের জন্য তা কেবল ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।
যখন আমরা মানুষের উপর অনুগ্রহ করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও অহংকারে দূরে সরে যায়। আর যখন তাকে মন্দ স্পর্শ করে, তখন সে হতাশ হয়ে পড়ে।
বল, প্রত্যেকে নিজ নিজ ধারণামতে কাজ করে। অথচ তোমাদের প্রতিপালকই সবচেয়ে ভাল জানেন কে সর্বাধিক সঠিক পথে আছে।
আর ওরা তোমাকে প্রশ্ন করছে ‘রূহ’ সম্পর্কে। তুমি বল, রূহ আমার প্রতিপালকের একটি আদেশ মাত্র। আর এ বিষয়ে তোমাদের অতি সামান্যই জ্ঞান দান করা হয়েছে।
আর যদি আমরা চাইতাম, তাহ’লে তোমার প্রতি (কুরআনের) যা কিছু আমরা অহি করেছি, সবই প্রত্যাহার করে নিতাম। তখন তুমি সেগুলি ফেরৎ নেওয়ার ব্যাপারে আমাদের বিরুদ্ধে কাউকে কর্মবিধায়ক রূপে পেতে না-
তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ ব্যতীত। নিশ্চয়ই তোমার উপর রয়েছে তাঁর মহা অনুগ্রহ।
তুমি বল, যদি মানুষ ও জিন জাতি এই কুরআনের ন্যায় আরেকটি কুরআন আনার জন্য একত্রিত হয়, তবু তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না। যদিও তারা পরস্পরে সাহায্যকারী হয়। (চ্যালেঞ্জ-৪)
আমরা মানুষের জন্য এই কুরআনে বিভিন্ন উপমা দিয়ে বিশদ বর্ণনা দান করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা প্রত্যাখ্যান ব্যতীত কিছুই করেনি।
আর তারা বলে, আমরা কখনোই তোমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করব না যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি থেকে ঝর্ণাধারা বের করে আনবে।
অথবা তোমার জন্য খেজুর ও আঙ্গুরের বাগিচা হবে। যার মধ্যে তুমি ব্যাপকভাবে নদী-নালা প্রবাহিত করাবে।
অথবা আকাশকে টুকরা টুকরা করে আমাদের উপরে ফেলবে যেমন তুমি আমাদের নিকট ধারণা ব্যক্ত করে থাক। অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে সম্মুখে এনে হাযির করবে।
অথবা তোমার জন্য একটি স্বর্ণের প্রাসাদ হবে। অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে। অবশ্য আমরা তোমার আকাশে আরোহণে বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না তুমি সেখান থেকে (তোমার সত্যায়নে) কোন কিতাব নাযিল করাবে। যা আমরা পড়ে দেখব। তুমি বল, আমার প্রতিপালক (এসব থেকে) পবিত্র। আর আমি একজন মানুষ ও রাসূল বৈ কিছু নই।
বস্ত্তত যখন মানুষের কাছে হেদায়াত (রাসূল) আসে, তখন তাদেরকে ঈমান আনা হ’তে বিরত রাখে তাদের এই উক্তি যে, ‘আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?’
তুমি বল, যদি ফেরেশতারা পৃথিবীতে স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করত, তাহ’লে আমরা আকাশ থেকে নিশ্চয়ই তাদের নিকট কোন ফেরেশতাকে রাসূল করে পাঠাতাম।
বল, আমার ও তোমাদের মাঝে সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। অবশ্যই তিনি স্বীয় বান্দাদের ভালভাবে জানেন ও দেখেন।
আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেন, সেই-ই সুপথ প্রাপ্ত হয়। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি তাদের জন্য তাঁকে ব্যতীত কাউকে বন্ধু হিসাবে পাবে না। আমরা তাদেরকে ক্বিয়ামতের দিন সমবেত করব মুখের উপর ভর দিয়ে চলা অবস্থায় অন্ধ, বোবা ও বধির করে। তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। যখনই তা স্তিমিত হবে, তখনই আমরা তাদের উপর অগ্নি বৃদ্ধি করে দেব।
এটাই তাদের প্রতিফল। কারণ তারা আমাদের আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল এবং বলেছিল, যখন আমরা হাড়-হাড্ডিতে পরিণত হব ও মাটি হয়ে যাব, তখনও কি আমরা নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?
তারা কি দেখেনা, যে আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের মত (মানুষকে) সৃষ্টি করতে সক্ষম? তিনি তাদের জন্য একটি মেয়াদ নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যালেমরা সত্য প্রত্যাখ্যান ব্যতীত আর কিছুই করে না।
বল, যদি তোমরা আমার প্রতিপালকের দয়ার ভান্ডারের অধিকারী হ’তে, তবুও তোমরা তা ধরে রাখতে ব্যয় হয়ে যাবার ভয়ে। বস্ত্তত মানুষ অতিশয় কৃপণ।
আর নিশ্চয়ই আমরা মূসাকে নয়টি স্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছিলাম। অতএব তুমি বনু ইস্রাঈলদের জিজ্ঞেস কর, যখন সে তাদের কাছে এসেছিল, তখন ফেরাঊন তাকে বলেছিল, আমি ধারণা করি হে মূসা! তুমি অবশ্যই একজন জাদুগ্রস্ত ব্যক্তি।
মূসা বলল (হে ফেরাঊন!) তুমি তো জানো যে, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের পালনকর্তাই এসব নাযিল করেছেন প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ। আর আমি হে ফেরাঊন! তোমাকে ধারণা করছি যে তুমি অবশ্যই ধ্বংস হ’তে চলেছ।
অতঃপর ফেরাঊন তাদেরকে (অর্থাৎ বনু ইস্রাঈলকে) দেশ থেকে উচ্ছেদ করার সংকল্প করল। ফলে আমরা তাকে ও তার সাথী সবাইকে (সাগরে) ডুবিয়ে মারলাম।
এরপর আমরা বনু ইস্রাঈলকে বললাম, তোমরা দেশে বসবাস কর। অতঃপর যখন ক্বিয়ামতের প্রতিশ্রুতি এসে যাবে, তখন আমরা তোমাদের (শত্রু-মিত্র) সবাইকে মিলিত করব।
আর সত্যসহ আমরা কুরআন নাযিল করেছি এবং সত্যসহ তা নাযিল হয়েছে। আর আমরা তোমাকে প্রেরণ করেছি কেবল (জান্নাতের) সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শনকারীরূপে।
আর আমরা কুরআন নাযিল করেছি খন্ড খন্ডভাবে। যাতে তুমি থেমে থেমে তা লোকদের নিকট পাঠ করতে পার। আর আমরা একে নাযিল করেছি পর্যায়ক্রমে।
তুমি বল, তোমরা কুরআনে বিশ্বাস করো বা না করো (এটি নিশ্চিতভাবে সত্য)। যাদেরকে ইতিপূর্বে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের (অর্থাৎ আহলে কিতাবদের) উপর যখনই এটি পাঠ করা হয়েছে, তখনই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়েছে।
আর তারা বলে, মহাপবিত্র আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পালনকর্তার প্রতিশ্রুতি অবশ্যই কার্যকর হয়ে থাকে।
আর তারা কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয় আরও বৃদ্ধি পায়। (সিজদা-৪)
বল, তোমরা ‘আল্লাহ’ নামে ডাক বা ‘রহমান’ নামে ডাক, তোমরা যে নামেই ডাকো না কেন, সকল সুন্দর নাম তো কেবল তাঁরই জন্য। আর তুমি তোমার ছালাতে ক্বিরাআতের স্বর অধিক উঁচু করোনা বা একেবারে নীচু করোনা। বরং দু’য়ের মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন কর।
আর তুমি বল, সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহ্রই জন্য। যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেন না এবং যার রাজত্বে কোন শরীক নেই। যিনি কোন দুর্দশায় পড়েন না যে, তাঁর কোন সাহায্যকারী প্রয়োজন হয়। আর তুমি যথার্থভাবে তাঁর বড়ত্ব ঘোষণা কর।