بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
ত্বোয়াহা।
আমরা তোমার উপর কুরআন নাযিল করিনি তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য।
বরং (নাযিল করেছি) তাদেরকে উপদেশ দানের জন্য যারা আল্লাহকে ভয় করে।
এটি তাঁর নিকট থেকে পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ। যিনি ভূমন্ডল ও সুউচ্চ নভোমন্ডল সৃষ্টি করেছেন।
দয়াময় আরশে উন্নীত।
তাঁরই জন্য সবকিছু, যা আছে নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে এবং এ দু’য়ের মাঝে। আর যা আছে ভূগর্ভে।
যদি তুমি উচ্চস্বরে কথা বল, তথাপি তিনি তো গোপন ও অতি গোপন সবকিছু জানেন।
আল্লাহ। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তাঁর জন্যই রয়েছে সুন্দর নামসমূহ।
আর তোমার নিকটে মূসার বৃত্তান্তপৌঁছেছে কি?
যখন সে আগুন দেখল, তখন তার পরিবারকে বলল, তোমরা এখানে থাক। আমি আগুন দেখেছি। আশা করি আমি সেখান থেকে তোমাদের জন্য কিছু আগুন আনতে পারব অথবা আমি সেখানে গিয়ে পথের দিশা পাব।
অতঃপর যখন সে আগুনের নিকটে আসল তখন তাকে আহবান করা হ’ল, হে মূসা!
নিশ্চয় আমিই তোমার প্রতিপালক। অতএব তুমি তোমার জুতা খুলে ফেল। কেননা তুমি পবিত্র ‘তুওয়া’ উপত্যকায় রয়েছ।
আর আমি তোমাকে মনোনীত করেছি। অতএব তুমি মনোযোগ দিয়ে শোন যা তোমাকে অহি করা হচ্ছে।
নিশ্চয় আমিই আল্লাহ! আমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। অতএব আমার ইবাদত কর এবং তুমি ছালাতে দন্ডায়মান হও আমার স্মরণে।
নিশ্চয়ই ক্বিয়ামত আসবে। আমি সেটা গোপন রাখতে চাই। যাতে প্রত্যেকে স্ব স্ব কর্ম অনুযায়ী ফল লাভ করতে পারে।
সুতরাং যে ব্যক্তি ক্বিয়ামতে বিশ্বাস করেনা ও নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে উক্ত বিশ্বাস থেকে নিবৃত্ত না করে। তাহ’লে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।
আর হে মূসা! তোমার ডান হাতে ওটা কি?
সে বলল, এটা আমার লাঠি। এতে আমি ভর দেই এবং এটা দিয়ে আমার মেষপালের জন্য গাছের পাতা পাড়ি। তাছাড়া এতে আমার অন্যান্য কাজও রয়েছে।
আল্লাহ বললেন হে মূসা! তুমি ওটা ফেলে দাও।
অতঃপর সে ওটা ফেলে দিল। অমনি তা সাপ হয়ে ছুটাছুটি করতে লাগল।
তিনি বললেন, তুমি ওটাকে ধর। ভয় পেয়ো না। আমরা নিশ্চয়ই ওকে তার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেব।
আর তোমার হস্ততালুটি তোমার বগলে রাখ। দেখবে তা বেরিয়ে আসবে নির্মল প্রদীপ্ত অবস্থায় অন্য একটি নিদর্শন রূপে।
এটা এজন্য যে, আমরা তোমাকে আমাদের বড় বড় নিদর্শন সমূহ থেকে কিছু দেখিয়ে দেব।
(এখন) তুমি ফেরাঊনের কাছে যাও। সে সীমালংঘন করেছে।
মূসা বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রসারিত করে দাও!
আমার কাজ সহজ করে দাও!
আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দাও!
যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।
আর আমার পরিবারের মধ্য থেকে আমার জন্য একজন সাহায্যকারী নিযুক্ত করে দাও-
আমার ভাই হারূণকে।
তার মাধ্যমে আমার শক্তিকে দৃঢ় কর।
এবং তাকে আমার কাজে অংশীদার করে দাও-
যাতে আমরা অধিকহারে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করতে পারি-
এবং অধিকহারে তোমাকে স্মরণ করতে পারি।
নিশ্চয়ই তুমি তো আমাদের অবস্থা সবই দেখছ।
আল্লাহ বললেন, হে মূসা! তুমি যা চেয়েছ, সবই তোমাকে দেওয়া হ’ল।
(এছাড়া) তোমার প্রতি আমরা আরও একবার অনুগ্রহ করেছিলাম।
যখন আমরা তোমার মায়ের কাছে ‘ইলহাম’ করেছিলাম যা করার ছিল।
তা এই যে, তুমি (মূসাকে) সিন্দুকে ভর। অতঃপর সিন্দুকটিকে নদীতে ভাসিয়ে দাও। যাতে নদী তাকে তীরে ঠেলে দেয়। তখন ওকে (তীরে) উঠিয়ে নেবে আমার শত্রু ও তার শত্রু। আর (হে মূসা) আমি তোমার উপর আমার পক্ষ হ’তে মহববত ঢেলে দিয়েছিলাম (যাতে তোমাকে দেখে শত্রু দুর্বল হয়ে পড়ে) এবং যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও।
যখন তোমার বোন এসে বলল, আমি কি তোমাদের বলব, কে এই বাচ্চাকে লালন-পালনের ভার নিতে পারবে? এভাবে আমরা তোমাকে তোমার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দিলাম যাতে তার চক্ষু শীতল হয় এবং সে চিন্তিত না হয়। আর তুমি এক ব্যক্তিকে (ভুলক্রমে) হত্যা করেছিলে। অতঃপর আমরা তোমাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। এভাবে আমরা তোমাকে অনেক পরীক্ষায় ফেলেছি। অতঃপর তুমি মাদিয়ানবাসীদের মধ্যে অবস্থান করেছিলে। হে মূসা! অবশেষে তুমি নির্ধারিত সময়ে এসে উপস্থিত হয়েছ।
আর আমি তোমাকে আমার (রিসালাতের) জন্য প্রস্ত্তত করে নিয়েছি।
তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শন সমূহ নিয়ে যাও এবং আমার স্মরণে গাফলতি করো না।
তোমরা দু’জন ফেরাঊনের নিকটে যাও। নিশ্চয়ই সে সীমালংঘন করেছে।
অতঃপর তার সাথে নম্রভাবে কথা বল। হয়ত সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।
তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আশংকা করছি যে, সে আমাদের উপর বাড়াবাড়ি করবে অথবা সীমালংঘন করবে।
আল্লাহ বললেন, তোমরা ভয় পেয়োনা। নিশ্চয়ই আমি (জ্ঞানের মাধ্যমে) তোমাদের সাথে আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি।
অতএব তোমরা তার নিকটে যাও এবং বল, আমরা তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত রাসূল। সুতরাং আমাদের সাথে বনু ইস্রাঈলদের যেতে দাও এবং তাদেরকে নির্যাতন করোনা। আমরা তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে নিদর্শন নিয়ে তোমার কাছে এসেছি। আর শান্তি ঐ ব্যক্তির উপর যে সৎপথ অবলম্বন করে।
আর আমাদের নিকট অহি করা হয়েছে যে, শাস্তি আপতিত হবে ঐ ব্যক্তির উপর, যে মিথ্যারোপ করে ও (সত্য থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়।
ফেরাঊন বলল, কে তোমাদের প্রতিপালক হে মূসা!
মূসা বলল, আমাদের প্রতিপালক তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্ত্তকে তার যথাযোগ্য আকৃতি দান করেছেন। অতঃপর তাকে পথ প্রদর্শন করেছেন।
ফেরাঊন বলল, তাহ’লে বিগত যুগের লোকদের অবস্থা কি?
মূসা বলল, তাদের খবর আমার প্রতিপালকের নিকট (লওহে মাহফূযে) লিপিবদ্ধ আছে। আমার প্রতিপালক ভুলে যান না এবং ভুলও করেন না।
যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বিছানা স্বরূপ করেছেন এবং তার মধ্যে তোমাদের জন্য রাস্তাসমূহ করে দিয়েছেন। আর তিনি আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেন। (আল্লাহ বলেন) অতঃপর আমরা তার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি।
তোমরা (তা থেকে) ভক্ষণ কর এবং (সেখানে) তোমাদের গবাদিপশু চরাও। নিশ্চয়ই এর মধ্যে বিবেকবানদের জন্য নিদর্শন সমূহ রয়েছে।
মাটি থেকেই আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি এবং এ মাটিতেই তোমাদের ফিরিয়ে নেব। অতঃপর তা থেকেই আমরা তোমাদের পুনরুত্থান ঘটাব।
আর আমরা তাকে (ফেরাঊনকে) সকল নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। কিন্তু সে তাতে মিথ্যারোপ করে ও অস্বীকার করে।
সে বলল, হে মূসা! তুমি কি আমাদের কাছে এসেছ তোমার জাদু দিয়ে আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বের করে দেবার জন্য?
তাহ’লে আমরাও তোমার নিকটে অনুরূপ জাদু উপস্থাপন করব। অতএব তুমি আমাদের ও তোমার মাঝে একটা দিন নির্ধারণ কর সমতল ভূমিতে, যার বরখেলাফ আমরাও করব না তুমিও করবে না।
মূসা বলল, তোমাদের সাথে প্রতিশ্রুতি রইল উৎসবের দিন। যেদিন প্রথম প্রহরে লোকেরা সমবেত হবে।
অতঃপর ফেরাঊন উঠে গেল এবং তার কৌশল সমূহ একত্রিত করল। অতঃপর সে (প্রতিশ্রুত দিবসে) উপস্থিত হ’ল।
মূসা তাদের বলল, দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহ্র উপর মিথ্যারোপ করো না। তাহ’লে তিনি তোমাদের আযাব দিয়ে ধ্বংস করে দিবেন। বস্ত্তত যে ব্যক্তি আল্লাহ্র উপর মিথ্যারোপ করে, সে নিরাশ হয়।
অতঃপর তারা নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করল এবং গোপনে শলা-পরামর্শ করল।
(অবশেষে তারা) বলল, এ দু’জন দুই জাদুকর। তারা তাদের জাদু দিয়ে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিতে চায় এবং তোমাদের উৎকৃষ্ট জীবন পদ্ধতি বিনষ্ট করতে চায়।
অতএব তোমরা তোমাদের কলা-কৌশল সংহত কর। অতঃপর সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হও। নিশ্চয় সে-ই আজ সফলকাম হবে, যে বিজয়ী হবে।
জাদুকররা বলল, হে মূসা! হয় তুমি নিক্ষেপ কর, না হয় আমরা প্রথমে নিক্ষেপ করি।
মূসা বলল, বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। অতঃপর তাদের জাদুর প্রভাবে তার মনে হ’ল যেন তাদের রশিগুলি ও লাঠিগুলি ছুটাছুটি করছে।
এতে মূসার মনে কিছুটা ভীতির সঞ্চার হ’ল।
আমরা বললাম, ভয় পেয়ো না। নিশ্চয় তুমিই বিজয়ী।
তোমার ডান হাতে যা আছে, তা নিক্ষেপ কর। এটা সবকিছু গ্রাস করে ফেলবে, যা তারা করেছে। তারা যা করেছে তা তো জাদুকরের কৌশল বৈ কিছু নয়। আর জাদুকর যেভাবেই আসুক তা সফল হবে না।
অতঃপর জাদুকররা সিজদায় পড়ে গেল এবং উঠে বলল, আমরা হারূণ ও মূসার রব-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম।
ফেরাঊন বলল, আমি অনুমতি দেওয়ার আগেই তোমরা তার উপর ঈমান আনলে? নিশ্চয় সেই-ই তোমাদের গুরু, যে তোমাদের জাদু শিখিয়েছে। অতএব আমি অবশ্যই তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে টুকরা টুকরা করে কাটবো এবং খেজুর গাছের কান্ড সমূহে বেঁধে শূলে চড়াব। আর তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে আমাদের মধ্যে কার শাস্তি কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী।
তারা বলল, আমাদের নিকট যে স্পষ্ট প্রমাণাদি এসেছে তার উপর এবং আমাদের যিনি সৃষ্টি করেছেন তার উপর আমরা কখনোই আপনাকে প্রাধান্য দিব না। অতএব আপনি যা খুশী করুন। আর আপনি তো কেবল এই পার্থিব জীবনেই কিছু করবেন।
আমরা আমাদের প্রতিপালকের উপর ঈমান এনেছি। যাতে তিনি আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করেন এবং আপনি আমাদেরকে যে জাদু করতে বাধ্য করেছেন তা (মার্জনা করেন)। বস্ত্তত আল্লাহই শ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী।
(আল্লাহ বলেন,) নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিকট উপস্থিত হবে অপরাধী হিসাবে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম। সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না।
আর যে ব্যক্তি তাঁর নিকটে উপস্থিত হবে সৎকর্মশীল মুমিন হিসাবে, তাদের জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদা সমূহ।
আর রয়েছে স্থায়ী বসবাসের জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। যেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটা কেবল তাদেরই প্রতিদান, যারা পরিশুদ্ধ হয়েছে।
আর নিশ্চয়ই আমরা মূসার নিকট প্রত্যাদেশ করেছিলাম যে, তুমি আমার বান্দাদের নিয়ে রাতেই বেরিয়ে যাও। অতঃপর তাদের জন্য সমুদ্রের মধ্যে শুষ্ক পথ অবলম্বন কর। ধরে ফেলার বা ডুবে যাবার ভয় করো না।
অতঃপর ফেরাঊন তার সেনাবাহিনীসহ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। তখন সমুদ্র তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করল।
বস্ত্তত ফেরাঊন তার কওমকে পথভ্রষ্ট করেছিল এবং সে তাদেরকে সৎপথ দেখায়নি।
হে ইস্রাঈল সন্তানগণ! আমরা তোমাদেরকে তোমাদের শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করেছি এবং তূর পাহাড়ের দক্ষিণ পার্শ্বে তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দান করেছি। আর তোমাদের উপর মান্না ও সালওয়া নাযিল করেছি।
(আর বলেছিলাম) তোমরা আমাদের দেওয়া পবিত্র রূযী সমূহ ভক্ষণ কর এবং এতে সীমালংঘন করো না। তাহ’লে তোমাদের উপর আমার ক্রোধ অবধারিত হবে। বস্ত্তত যার উপর আমার ক্রোধ অবধারিত হয়, সে ধ্বংস হয়ে যায়।
আর আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল ঐ ব্যক্তির প্রতি, যে তওবা করে এবং ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। অতঃপর সৎপথে অবিচল থাকে।
হে মূসা! তোমার সম্প্রদায়কে পিছনে ফেলে আগে আসতে কোন্ বস্ত্ত তোমাকে ব্যস্ত করে তুলল?
সে বলল, এই তো তারা আমার পিছনেই আসছে। আর হে আমার প্রতিপালক! আমি দ্রুত তোমার কাছে চলে এলাম যাতে তুমি খুশী হও।
আল্লাহ বললেন, আমরা তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলেছি তুমি চলে আসার পর। আর সামেরী তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।
অতঃপর মূসা তার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে গেল ভীষণ ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ অবস্থায়। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদেরকে এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেননি? তবে কি প্রতিশ্রুতির সময়কাল তোমাদের নিকট দীর্ঘ হয়ে গেছে? না কি তোমরা চেয়েছ যে, তোমাদের উপর তোমাদের প্রতিপালকের ক্রোধ অবধারিত হয়ে যাক। যে কারণে তোমরা আমার সাথে অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে?
তারা বলল, আমরা আপনার নিকট কৃত অঙ্গীকার স্বেচছায় ভঙ্গ করিনি। কিন্তু আমাদের উপর কওমের অলংকারের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর আমরা তা (আগুনে) নিক্ষেপ করি। এমনিভাবে সামেরীও নিক্ষেপ করে।
অতঃপর সে তাদের জন্য (সেখান থেকে) একটা গো-বৎসের দেহ বের করে আনে, যাতে গরুর ডাকের মত একটা শব্দ ছিল। অতঃপর তারা বলল, এটি তোমাদের উপাস্য এবং মূসার উপাস্য। যা তিনি পরে ভুলে গেছেন।
(আল্লাহ বলেন,) তারা কি দেখে না যে, এটা তাদের কোন কথার উত্তর দেয় না এবং তাদের কোন ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না।
অবশ্য হারূণ তাদের আগেই বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! এর দ্বারা তোমরা একটা পরীক্ষায় পতিত হয়েছ। তোমাদের প্রতিপালক দয়াময়। অতএব তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মেনে চল।
তারা বলল, মূসা আমাদের নিকট. ২ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর পূজাতেই লেগে থাকব।
(অতঃপর ফিরে এসে) মূসা বলল, হে হারূণ! তুমি যখন এদের পথভ্রষ্ট হ’তে দেখলে, তখন কোন বস্ত্ত তোমাকে বাধা দিয়েছিল-
যে তুমি আমার অনুসরণ করলে না? তবে কি তুমি আমার আদেশ অমান্য করেছ?
হারূণ বলল, হে আমার সহোদর ভাই! আমার দাড়ি ও মাথা ধরে টেনো না। আমি ভয় পেয়েছিলাম তুমি এসে বলবে যে, তুমি বনু ইস্রাঈলদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছ এবং আমার কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করোনি।
মূসা বলল, হে সামেরী! বল তোমার কৈফিয়ত কি!
সে বলল, আমি দেখেছিলাম যা অন্যেরা দেখেনি। ফলে আমি সেই প্রেরিত দূতের পদচিহ্ন স্থল হ’তে এক মুষ্টি মাটি নিয়েছিলাম। অতঃপর আমি তা নিক্ষেপ করেছিলাম। আর আমার মন আমাকে এইরূপ কুমন্ত্রণা দিয়েছিল।
মূসা বলল, দূর হও! তোমার জন্য সারা জীবন এ শাস্তিই রইল যে, তুমি বলবে, ‘আমি অস্পৃশ্য’। আর তোমার জন্য রইল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ। যার ব্যতিক্রম হবে না। তুমি তোমার সেই উপাস্যের (গো-বৎসের) প্রতি লক্ষ্য কর যাকে নিয়ে তুমি থাকতে। আমরা সেটিকে জ্বালিয়ে দেবই। অতঃপর ওটাকে ভস্ম করে সাগরে ছড়িয়ে দেবই।
তোমাদের উপাস্য কেবলমাত্র আল্লাহ। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তাঁর জ্ঞান সকল বিষয়ে পরিব্যপ্ত।
এভাবে আমরা অতীত কিছু বৃত্তান্ততোমাকে বর্ণনা করলাম। আর আমরা আমাদের পক্ষ হ’তে তোমাকে দান করেছি কুরআন।
এটা থেকে যে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে ক্বিয়ামতের দিন (কঠিন পাপের) বোঝা বহন করবে।
(দুনিয়াতে) ঐ পাপের মধ্যে তারা চিরকাল থাকবে। আর ক্বিয়ামতের দিন ঐ পাপের বোঝা তাদের জন্য ডেকে আনবে কতই না মন্দ পরিণতি!
যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, সেদিন আমরা অপরাধীদের সমবেত করব নীলচক্ষু (দৃষ্টিহীন) অবস্থায়।
তারা (সেদিন) নিজেদের মধ্যে চুপে চুপে বলাবলি করবে, দুনিয়ায় তোমরা দশ দিন মাত্র অবস্থান করেছিলে।
(অথচ) আমরা ভালভাবেই জানি যখন তাদের জ্ঞানী ব্যক্তিটি বলবে, তোমরা (দুনিয়ায়) একদিনের বেশী অবস্থান করোনি।
আর তারা তোমাকে (ক্বিয়ামতের দিন) পাহাড় সমূহের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তুমি বল, আমার প্রতিপালক ওগুলি সমূলে উৎপাটিত করে (ধূলির মত) উড়িয়ে দিবেন।
অতঃপর তিনি পৃথিবীকে সমতল ভূমিতে পরিণত করবেন।
যেখানে তুমি কোনরূপ বক্রতা বা উচ্চতা (অর্থাৎ উঁচু-নীচু) দেখতে পাবে না।
সেদিন তারা একজন আহবানকারীর (ইস্রাফীলের ফুঁকের) অনুসরণ করবে। যার অনুসরণ থেকে ডাইনে-বামে যাবার উপায় থাকবে না। দয়াময়ের সামনে সেদিন সমস্ত কলরব স্তব্ধ হয়ে যাবে। কেবল মৃদু শব্দ ব্যতীত তুমি কিছুই শুনতে পাবে না।
সেদিন কারু সুফারিশ কোন কাজে আসবে না। দয়াময় যাকে অনুমতি দিবেন এবং যার কথায় তিনি সন্তুষ্ট হবেন, সে ব্যতীত।
তিনি তাদের অগ্র-প্রশ্চাৎ সবই জানেন। আর তারা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না।
আর চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক মহান সত্তার সম্মুখে (সেদিন) সকল চেহারা হবে অবনমিত। আর নিরাশ হবে যে ব্যক্তি যুলুমের বোঝা বহন করবে।
তবে যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম সমূহ সম্পাদন করে, সে ব্যক্তি ঐদিন কোনরূপ অবিচার বা ক্ষতির ভয় করবে না।
আর এভাবেই আমরা আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করেছি এবং তাতে বিশদভাবে সতর্কবাণী বিবৃত করেছি, যাতে তারা সংযত হয় অথবা তাদের জন্য এটা উপদেশ হয়।
অতএব আল্লাহ সর্বোচ্চ, তিনিই যথার্থ মালিক। আর তোমার প্রতি তাঁর অহি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুমি কুরআন মুখস্ত করার ব্যাপারে ব্যস্ততা প্রদর্শন করো না। আর বল, হে প্রভু! তুমি আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও।
আর আমরা ইতিপূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু সে তা ভুলে গেল এবং আমরা তার মধ্যে (সংকল্পের) দৃঢ়তা পাইনি।
যখন আমরা ফেরেশতাদের বললাম তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন তারা সিজদা করল ইবলীস ব্যতীত। সে অস্বীকার করল।
অতঃপর আমরা বললাম, হে আদম! এটি তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু। অতএব সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের না করে দেয়। তাহ’লে তুমি কষ্টে পতিত হবে।
নিশ্চয়ই তোমার জন্য এটাই বিধান রইল যে, তুমি এখানে ক্ষুধার্ত হবেনা বা নগ্ন হবেনা।
আর তুমি এখানে তৃষ্ণার্ত হবেনা বা রৌদ্র তাপ ভোগ করবেনা।
অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল। সে বলল, হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্ত জীবন দানকারী এক বৃক্ষের কথা এবং অবিনশ্বর এক রাজত্বের কথা?
অতঃপর তারা উভয়ে উক্ত বৃক্ষের (ফল) ভক্ষণ করল। ফলে তাদের গুপ্তাঙ্গ প্রকাশিত হয়ে পড়ল এবং তারা জান্নাতের বৃক্ষপত্রসমূহ দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগলো। এভাবে আদম (ভুলক্রমে) তার প্রতিপালকের নাফরমানী করল এবং পথ হারাল।
অতঃপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন। তার তওবা কবুল করলেন এবং তাকে সুপথ প্রদর্শন করলেন।
তিনি বললেন, তোমরা উভয়ে জান্নাত থেকে নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু। অতঃপর যখন তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে হেদায়াত আসবে, তখন যে আমার হেদায়াতের অনুসরণ করবে, সে (দুনিয়াতে) পথভ্রষ্ট হবে না এবং (আখেরাতে) কষ্টে পতিত হবে না।
আর যে ব্যক্তি আমার কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবিকা হবে সংকুচিত এবং ক্বিয়ামতের দিন আমরা তাকে উঠাব অন্ধ অবস্থায়।
সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেন তুমি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালে? অথচ আমি তো (দুনিয়াতে) ছিলাম চক্ষুষ্মান।
আল্লাহ বলবেন, এটাই তো বিধান। তোমার কাছে আমাদের আয়াতসমূহ এসেছিল। অতঃপর তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। আর সেভাবেই তুমি আজ উপেক্ষিত হ’লে।
আর এভাবেই আমরা তাকে প্রতিফল দেব, যে বাড়াবাড়ি করে এবং তার প্রতিপালকের আয়াত সমূহে বিশ্বাস স্থাপন করেনা। নিশ্চয়ই পরকালের শাস্তি অতীব কঠোর ও সর্বাধিক স্থায়ী।
এটা কি তাদের পথ দেখালো না যে, তাদের পূর্বেকার বহু যুগ-সম্প্রদায়কে আমরা ধ্বংস করেছি। যাদের আবাসভূমি গুলিতে এরা বিচরণ করে। নিশ্চয়ই এতে বিবেকবানদের জন্য নিদর্শনসমূহ রয়েছে।
যদি তোমার প্রভুর পক্ষ হ’তে একটা পূর্ব সিদ্ধান্ত এবং নির্দিষ্ট মেয়াদকাল না থাকত, তাহ’লে এদের উপর শাস্তি অবশ্যম্ভাবী হয়ে যেত।
অতএব এরা যা কিছু বলে, তাতে ধৈর্যধারণ কর এবং তোমার পালনকর্তার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা কর সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে। আর পবিত্রতা বর্ণনা কর রাত্রিকালে ও দিবসের প্রান্তসমূহে। সম্ভবত তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।
আর তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করো না ঐ সবের প্রতি, যা আমরা তাদের বিভিন্ন শ্রেণীর লোককে ভোগ্যবস্ত্ত রূপে দান করেছি পার্থিব জীবনের জাঁকজমক স্বরূপ। যাতে আমরা এর মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা নিতে পারি। বস্ত্তত তোমার প্রতিপালকের দেওয়া (আখেরাতের) রিযিক অধিক উত্তম ও সর্বাধিক স্থায়ী।
আর তুমি তোমার পরিবারকে ছালাতের আদেশ দাও এবং তুমি এর উপর অবিচল থাক। আমরা তোমার নিকট রূযী চাই না। আমরাই তোমাকে রূযী দিয়ে থাকি। আর (জান্নাতের) শুভ পরিণাম তো কেবল মুত্তাক্বীদের জন্যই নির্ধারিত।
তারা বলে, সে আমাদের কাছে তার প্রতিপালকের নিকট থেকে কোন নিদর্শন কেন নিয়ে আসে না? অথচ তাদের নিকটে কি (কুরআনের) প্রমাণ আসেনি যা পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে রয়েছে?
যদি আমরা এদেরকে ইতিপূর্বে কোন শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করতাম, তাহ’লে এরা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক! কেন তুমি আমাদের নিকট একজন রাসূল পাঠালে না? তাতে আমরা (আজকে) লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার আগেই (দুনিয়াতে) তোমার আয়াতসমূহ মেনে চলতাম!
বলে দাও, প্রত্যেকেই অপেক্ষারত। তোমরাও অপেক্ষা কর। অতঃপর শীঘ্র তোমরা জানতে পারবে কারা সরল পথের অনুসারী এবং কারা সুপথপ্রাপ্ত।