بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন। অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।
যখনই তাদের নিকট তাদের পালনকর্তার পক্ষ হ’তে কোন নতুন উপদেশ আসে, তখনই তারা খেলাচ্ছলে তা কান লাগিয়ে শোনে।
তাদের অন্তরগুলি তামাশা প্রবণ। আর যালেমরা গোপন শলা-পরামর্শে বলে, এ ব্যক্তি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ। তবুও কি তোমরা দেখে-শুনে জাদুর কবলে পড়বে?
নবী বলল, আমার প্রতিপালক নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সব কথাই জানেন। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
বরং তারা বলে, (কুরআনের আয়াতসমূহ) কল্পনা প্রসূত স্বপ্ন মাত্র। অথবা সে এগুলি মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে অথবা সে একজন কবি। অতএব সে (যদি সত্য নবী হয় তবে) আমাদের নিকটে কোন নিদর্শন নিয়ে আসুক, যেমন (নিদর্শন সহ) প্রেরিত হয়েছিলেন পূর্ববর্তী নবীগণ।
(আল্লাহ বলেন,) তাদের পূর্বে আমরা যেসব জনপদ ধ্বংস করেছি, (নিদর্শন দেখা সত্ত্বেও) তারা ঈমান আনেনি। তাহ’লে এরা কি এখন ঈমান আনবে?
আর তোমার পূর্বে আমরা তাদের নিকট মানুষ ব্যতীত কাউকে রাসূল করে পাঠাইনি। অতএব তোমরা (আহলে কিতাবের) জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর, যদি তোমরা না জানো।
আমরা তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে, তারা খাদ্য ভক্ষণ করত না। আর তারা চিরজীবীও ছিল না।
অতঃপর আমরা নবীদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম। তাদেরকে এবং (তাদের অনুসারী) যাদেরকে আমরা ইচ্ছা করলাম মুক্তি দিলাম। আর ধ্বংস করে দিলাম যালেমদের।
আমরা তোমাদের প্রতি কুরআন নাযিল করেছি। যার মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উপদেশ। তবুও কি তোমরা বুঝবে না?
আর আমরা কত জনপদকে ধ্বংস করেছি যারা ছিল পাপী এবং তাদের পরে আমরা সৃষ্টি করেছি অপর জাতি।
অতঃপর যখনই তারা আমাদের শাস্তি টের পেয়েছে, তখনই তারা দৌঁড়ে পালাতে শুরু করেছে।
তাদেরকে বলা হ’ল পালিয়োনা, ফিরে এসো তোমাদের ভোগ সম্ভারের নিকটে ও তোমাদের বিলাস গৃহ সমূহে। যাতে তোমরা জিজ্ঞাসিত হ’তে পার।
তারা বলল, হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো নিশ্চিতভাবে যালেম ছিলাম।
তাদের এই আর্তনাদ চলতে থাকে, যতক্ষণ না আমরা তাদেরকে বিধ্বস্ত শস্য ক্ষেত ও নির্বাপিত ভস্মস্ত্তপ সদৃশ করে ফেলি।
আর মনে রেখ আকাশ ও পৃথিবী এবং এ দু’য়ের মধ্যবর্তী যা আছে, তা আমরা খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি।
যদি আমরা এগুলি খেলাচ্ছলে করতে চাইতাম, তাহ’লে আমাদের পক্ষ থেকেই সেটা করতাম। কিন্তু আমরা তা করিনি।
বরং আমরা সত্যকে মিথ্যার উপর নিক্ষেপ করি। অতঃপর তা ওটাকে চূর্ণ করে দেয়। ফলে তা মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আর তোমরা যেসব কথা বল সেকারণ তোমাদের জন্য ধ্বংস!
নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে সবই তাঁর। আর তাঁর নিকটে যারা আছে (অর্থাৎ ফেরেশতারা), তারা তাঁর ইবাদতে বিমুখ হয়না এবং তারা ক্লান্তিবোধ করেনা।
তারা রাত্রি-দিন তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং তারা দুর্বল হয় না।
তবে কি তারা দুনিয়াতে বহু উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা মৃতদের পুনরুত্থান ঘটাতে সক্ষম?
যদি আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহ ব্যতীত বহু উপাস্য থাকত, তাহ’লে উভয়টিই ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের মালিক আল্লাহ মহা পবিত্র।
তিনি যা করেন, সে বিষয়ে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না। বরং তারাই জিজ্ঞাসিত হবে।
তবে কি তারা আল্লাহ ব্যতীত বহু উপাস্য গ্রহণ করে? তুমি বল, বেশ তাহ’লে তোমরা তোমাদের প্রমাণ নিয়ে এস। আর এটাই হ’ল উপদেশ সেই কিতাবের যা আমার সাথে আছে (অর্থাৎ কুরআনের) এবং যা আমার পূর্বে ছিল (অর্থাৎ পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের)। কিন্তু তাদের অধিকাংশই সত্য সম্পর্কে জানেনা। ফলে তারা তা এড়িয়ে চলে।
আর তোমার পূর্বে আমরা এমন কোন রাসূল প্রেরণ করিনি যার নিকট আমরা এই অহি করিনি যে, আমি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। অতএব তোমরা আমার ইবাদত কর।
তারা বলে ‘দয়াময়’ (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন। (অথচ) তিনি (এসব থেকে) পবিত্র। বরং (ফেরেশতারা আল্লাহ্র) সম্মানিত বান্দা।
তারা আল্লাহ্র আগে বেড়ে কোন কথা বলে না। আর তারা তাঁর আদেশ মতই কাজ করে থাকে।
তাদের আগে-পিছে যা কিছু আছে, সবই তিনি জানেন। আর তারা কোন সুফারিশ করে না, কেবল যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট এবং তারা থাকে তাঁর ভয়ে সদা সন্ত্রস্ত।
আর তাদের মধ্যে যে বলবে আমিই উপাস্য তিনি ব্যতীত, আমরা তাকে জাহান্নামের শাস্তি দেব। বস্ত্তত এভাবেই আমরা যালেমদের শাস্তি দিয়ে থাকি।
অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল উভয়ে যুক্ত ছিল। অতঃপর আমরা উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং আমরা পানি দ্বারা সকল প্রাণবান বস্ত্তকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না?
আমরা পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বতমালা সৃষ্টি করেছি, যাতে তা তার বাসিন্দাদের নিয়ে টলতে না পারে। আর আমরা তার মধ্যে প্রশস্ত পথ সমূহ সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা গন্তব্যে পৌঁছতে পারে।
আর আমরা আকাশকে সুরক্ষিত ছাদে পরিণত করেছি। অথচ তারা সেখানকার নিদর্শন সমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।
তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকেই আকাশে (নিজ নিজ কক্ষ পথে) সন্তরণশীল।
আমরা তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি। অতএব তোমার মৃত্যু হ’লে কি তারা চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে?
প্রাণী মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর আমরা তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমাদের কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।
অবিশ্বাসীরা যখন তোমাকে দেখে, তখন তারা তোমাকে কেবল ঠাট্টার পাত্ররূপে গ্রহণ করে। আর বলে একি সেই ব্যক্তি যে তোমাদের উপাস্যদের সমালোচনা করে? অথচ তারাই ‘রহমান’-এর উপদেশ (কুরআন)-কে প্রত্যাখ্যান করে।
মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরাপ্রবণ। সত্বর আমি তোমাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ (প্রতিফল সমূহ) দেখাব। অতএব শাস্তি দ্রুত এসে পড়ার জন্য তোমরা আমার নিকট ব্যস্ততা প্রদর্শন করোনা।
তারা বলে শাস্তিদানের এই ধমকি কবে বাস্তবায়িত হবে? যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।
যদি অবিশ্বাসীরা সেই সময়ের কথা জানত, যখন তারা তাদের সম্মুখ থেকে ও পিছন থেকে আগুন ঠেকাতে পারবে না এবং তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।
বরং ওটা তাদের উপর আসবে আকস্মিকভাবে। অতঃপর তাদেরকে তা হতবুদ্ধি করে ফেলবে। তখন তারা আর ওটাকে ফিরাতে পারবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হবে না।
তোমার পূর্বেও অনেক রাসূলকে বিদ্রুপ করা হয়েছে। ফল হয়েছিল এই যে, যা নিয়ে তারা বিদ্রুপ করত, তা তাদের উপরেই আপতিত হয়েছিল (অর্থাৎ এলাহী গযব)।
বল, ‘রহমান’ (আল্লাহ)-এর বদলে কে তোমাদের হেফাযত করছে রাত্রি ও দিনে? বরং তারা তাদের প্রতিপালকের স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।
তবে কি আমরা ব্যতীত তাদের অন্য উপাস্যরা রয়েছে, যারা তাদেরকে রক্ষা করতে পারে? তারা তো নিজেদেরকেই সাহায্য করতে সক্ষম হবেনা এবং আমাদের (শাস্তি) মোকাবেলায় তারা আশ্রয়প্রাপ্ত হবে না।
বরং আমরাই তাদেরকে ও তাদের বাপ-দাদাদেরকে ভোগসম্ভার দান করেছিলাম। এমনকি তাদের আয়ুষ্কালও দীর্ঘ হয়েছিল। তারা কি দেখে না যে, আমরা তাদের জনপদকে চতুর্দিক থেকে সংকুচিত করে আনছি। তবুও কি তারা বিজয়ী হবে?
বল, আমি তো কেবল অহি-র মাধ্যমেই তোমাদের সতর্ক করি। কিন্তু বধিরদের যখন সতর্ক করা হয়, তখন তারা শুনতে পায় না।
তোমার পালনকর্তার শাস্তির কিছুমাত্রও তাদেরকে স্পর্শ করলে তারা বলতে থাকবে, হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা অবশ্যই যালেম ছিলাম।
আর ক্বিয়ামতের দিন আমরা ন্যায়বিচারের মানদন্ড সমূহ স্থাপন করব। অতএব কারু প্রতি সামান্যতম অবিচার করা হবে না। যদি একটি সরিষাদানা পরিমাণ কোন বিষয় থাকে, সেটিও আমরা উপস্থিত করব। বস্ত্তত হিসাব গ্রহণকারী হিসাবে আমরাই যথেষ্ট।
আমরা মূসা ও হারূণকে দিয়েছিলাম ফায়ছালাকারী গ্রন্থ, জ্যোতি ও উপদেশ আল্লাহভীরুদের জন্য।
যারা না দেখেই তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে এবং ক্বিয়ামতের ভয়ে সর্বদা ভীত থাকে।
আর এটি বরকতময় উপদেশ যা আমরা নাযিল করেছি। এরপরেও কি তোমরা একে অস্বীকার করবে?
ইতিপূর্বে আমরা ইব্রাহীমকে সুপথের জ্ঞান দান করেছিলাম। আর আমরা তার বিষয়ে সম্যক অবগত ছিলাম।
যখন সে তার পিতা ও সম্প্রদায়কে বলল, এই ভাস্কর্যগুলি কী, যাদের পূজায় তোমরা লিপ্ত আছ?
তারা বলল, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এদের পূজারী হিসাবে পেয়েছি।
সে বলল, তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছ।
তারা বলল, তুমি কি আমাদের কাছে সত্যসহ আগমন করেছ, না কৌতুক করছ?
সে বলল, বরং তোমাদের প্রতিপালক হ’লেন তিনি, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের প্রতিপালক, যিনি ওগুলি সৃষ্টি করেছেন। আর আমি ঐ বিষয়েরই অন্যতম সাক্ষ্যদাতা।
(সে মনে মনে বলল,) আল্লাহ্র কসম! তোমরা পিঠ ফিরে (মেলায়) চলে গেলে তোমাদের মূর্তিগুলির একটা সুরাহা আমি করবই।
অতঃপর সে মূর্তিগুলি গুঁড়িয়ে দিল বড়টিকে ছাড়া। যাতে তারা তার কাছে ফিরে যায়।
(মেলা থেকে ফিরে এসে) তারা বলল, আমাদের উপাস্যগুলির সাথে এরূপ আচরণ কে করল? নিশ্চয়ই সে অত্যাচারী।
লোকেরা বলল, আমরা এক যুবককে ওদের সমালোচনা করতে শুনেছি, তার নাম বলা হয় ইব্রাহীম।
তারা বলল, তাহ’লে তোমরা তাকে জনসমক্ষে হাযির কর, যাতে সকলে দেখতে পায়।
তারা বলল, হে ইব্রাহীম! তুমি কি আমাদের উপাস্যগুলির সাথে এরূপ আচরণ করেছ?
সে বলল, বরং তাদের এই বড়টাই এ কাজ করেছে। অতএব তোমরা ভাঙ্গা মূর্তিগুলিকে জিজ্ঞেস কর যদি তারা কথা বলতে পারে।
এতে লজ্জিত হয়ে তারা নিজেরা বলতে লাগল, আসলে তোমরাই তো অত্যাচারী।
অতঃপর অবনত মস্তকে তারা বলল, (হে ইব্রাহীম!) তুমি তো জান যে ওরা কোন কথা বলতে পারে না।
সে বলল, এর পরেও কি তোমরা আল্লাহ্র পরিবর্তে এমন কিছুর পূজা করবে, যা তোমাদের কোন উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না?
ধিক তোমাদের জন্য এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যাদের পূজা কর তাদের জন্য! তোমরা কি কিছুই বুঝ না?
তারা বলল, তোমরা একে পুড়িয়ে মার এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও।
আমরা বললাম, হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের উপর ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।
তারা ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে চক্রান্তের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু আমরা তাদেরকে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম।
আর আমরা তাকে ও (তার ভাতিজা) লূতকে উদ্ধার করে সেই দেশে (শামে) পৌঁছে দিলাম যেখানে আমরা বিশ্ববাসীদের জন্য কল্যাণ রেখেছিলাম।
আর আমরা তাকে দান করলাম (পুত্র) ইসহাককে এবং অতিরিক্ত হিসাবে (পৌত্র) ইয়াকূবকে। আর প্রত্যেককেই আমরা করেছিলাম সৎকর্মশীল।
আমরা তাদেরকে নেতা করেছিলাম। যারা আমাদের নির্দেশ অনুযায়ী মানুষকে সুপথ প্রদর্শন করত। আমরা তাদেরকে প্রত্যাদেশ করেছিলাম সৎকর্ম করতে, ছালাত আদায় করতে এবং যাকাত প্রদান করতে। আর তারা ছিল আমাদেরই অনুগত।
আর আমরা লূতকে দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান এবং তাকে উদ্ধার করেছিলাম ঐ জনপদ থেকে, যারা অশ্লীল কর্ম করত। তারা ছিল মন্দ ও অবাধ্য সম্প্রদায়।
আমরা তাকে আমাদের রহমতের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছিলাম এবং নিশ্চয়ই সে ছিল সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।
আর (তুমি স্মরণ কর) নূহ-এর কথা। ইতিপূর্বে যখন সে আহবান করেছিল। আর আমরা তার আহবানে সাড়া দিয়েছিলাম। অতঃপর আমরা তাকে ও তার পরিবারকে মহাসংকট থেকে উদ্ধার করেছিলাম।
আর আমরা তাকে সেই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছিলাম যারা আমাদের নিদর্শন সমূহকে অস্বীকার করেছিল। নিশ্চয়ই তারা ছিল এক মন্দ সম্প্রদায়। ফলে আমরা তাদের সবাইকে ডুবিয়ে মারলাম।
আর (তুমি স্মরণ কর) দাঊদ ও সুলায়মানের কথা। যখন তারা উভয়ে মীমাংসা করেছিল একটি শস্যক্ষেত বিষয়ে। সেখানে রাত্রিকালে কওমের এক লোকের মেষপাল প্রবেশ করেছিল। আর আমরা তাদের বিচার প্রত্যক্ষ করছিলাম।
অতঃপর আমরা সুলায়মানকে উক্ত বিষয়ে ফায়ছালার বুঝ দান করলাম। বস্ত্তত আমরা উভয়কে প্রজ্ঞা ও বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলাম। আর আমরা পাহাড় ও পক্ষীকুলকে দাঊদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, যারা তার সাথে তাসবীহ পাঠ করত। আর আমরাই ছিলাম এসবের কর্তা।
আর আমরা তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা যুদ্ধকালে তোমাদের রক্ষা করে। অতএব তোমরা কৃতজ্ঞ হবে কি?
আর আমরা প্রবল বায়ুকে সুলায়মানের অনুগত করে দিয়েছিলাম। যা তার নির্দেশমতে পরিচালিত হ’ত সেই জনপদের দিকে, যেখানে আমরা কল্যাণ রেখেছিলাম। বস্ত্তত সকল বিষয়ে আমরা ছিলাম সম্যক অবহিত।
আর জিন-শয়তানদের কিছু অংশকে, যারা তার জন্য সাগরে ডুব দিত (মণি-মুক্তা আহরণের জন্য) এবং এছাড়াও তারা অন্যান্য কাজ করত। আর আমরাই ছিলাম তাদের নিয়ন্ত্রণকারী।
আর (স্মরণ কর) আইয়ূবের কথা। যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, আমি কষ্টে পড়েছি। আর তুমি দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
তখন আমরা তার ডাকে সাড়া দিলাম। অতঃপর তার কষ্ট দূর করে দিলাম। আর তার পরিবার-পরিজনকে তার নিকটে ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমাদের পক্ষ হ’তে দয়াপরবশে। আর তাকে করলাম ইবাদতকারীদের জন্য দৃষ্টান্ত স্বরূপ।
আর (স্মরণ কর) ইসমাঈল, ইদ্রীস ও যুল-কিফ্ল-এর কথা। তাদের প্রত্যেকেই ছিল ধৈর্যশীল।
তাদেরকে আমরা আমাদের রহমতের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছিলাম। নিশ্চয়ই তারা ছিল সৎকর্মশীল।
আর (স্মরণ কর) মাছওয়ালা (ইউনুস)-এর কথা। যখন সে ক্রুদ্ধ অবস্থায় চলে গিয়েছিল এবং বিশ্বাসী ছিল যে, আমরা তাকে কোন কষ্টে ফেলব না। অতঃপর সে (মাছের পেটে) ঘন অন্ধকারের মধ্যে আহবান করল (হে আল্লাহ!) তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তুমি পবিত্র। আর নিশ্চয়ই আমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
অতঃপর আমরা তার দো‘আ কবুল করলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা হ’তে মুক্ত করলাম। আর এভাবেই আমরা বিশ্বাসীদের মুক্তি দিয়ে থাকি।
আর (স্মরণ কর) যাকারিয়ার কথা। যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে একাকী (নিঃসন্তান) ছেড়ে দিয়ো না। আর তুমিই তো সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।
অতঃপর আমরা তার দো‘আ কবুল করলাম এবং তাকে দান করলাম ইয়াহইয়াকে। আর গর্ভধারণের জন্য তার স্ত্রীকে সক্ষম করে দিলাম। তারা সর্বদা সৎকর্মে অগ্রণী থাকত। তারা আকাংখা ও ভীতির সাথে আমাদের আহবান করত। আর তারা ছিল আমাদের প্রতি বিনীত।
আর (স্মরণ কর) সেই নারী (মারিয়াম)-কে, যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল। অতঃপর আমরা তার (জামার) মধ্যে আমাদের রূহ ফুঁকে দেই। অতঃপর আমরা তাকে ও তার পুত্র (ঈসা)-কে বিশ্ববাসীর জন্য করি নিদর্শন স্বরূপ।
এরা সবাই তোমাদের একই উম্মতভুক্ত। আর আমিই তোমাদের পালনকর্তা। অতএব তোমরা আমারই ইবাদত কর।
কিন্তু মানুষ নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়েছে। অথচ সকলেই আমাদের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।
অতএব যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় কোন সৎকর্ম করে, তার কোন সৎকর্মই অস্বীকৃত হয় না। আর আমরা তা লিপিবদ্ধ করে রাখি।
আর যেসব জনপদকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি, সেসবের উপর এটাই বিধিবদ্ধ যে, তারা আর কখনোই (দুনিয়াতে) ফিরে আসবে না।
অবশেষে যখন ইয়াজূজ ও মাজূজ বন্ধনমুক্ত হবে এবং তারা প্রত্যেক উচ্চভূমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে-
এবং নিশ্চিত প্রতিশ্রুত সময় আসন্ন হবে, তখন অবিশ্বাসীদের চক্ষুসমূহ ভয়ে স্থির হয়ে যাবে এবং তারা বলবে, হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা এদিনের ব্যাপারে উদাসীন ছিলাম। বরং আমরা ছিলাম সীমালংঘনকারী।
নিশ্চয়ই তোমরা এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যাদের পূজা কর, সবই জাহান্নামের ইন্ধন। তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।
যদি তারা উপাস্য হ’ত, তাহ’লে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না। অথচ তাদের সবাই সেখানে চিরস্থায়ী হবে।
সেখানে তাদের জন্য থাকবে কেবল আর্তনাদ এবং সেখানে তারা কিছুই শুনতে পাবে না।
নিশ্চয়ই যাদের জন্য আমাদের নিকট কল্যাণ পূর্ব নির্ধারিত হয়েছে, তারা জাহান্নাম হ’তে দূরে থাকবে।
তারা জাহান্নামের ক্ষীণতম আওয়াযও শুনতে পাবে না এবং সেখানে তারা তাদের মনের চাহিদা সমূহের মধ্যে চিরকাল থাকবে।
সেদিনের মহা বিভীষিকা তাদেরকে চিন্তিত করবে না এবং ফেরেশতারা তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবে (ও বলবে) আজ সেই (পুরস্কারের) দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হ’ত।
সেদিন আমরা আকাশকে গুটিয়ে ফেলব, লিখিত দফতর গুটানোর ন্যায়। যে অবস্থায় আমরা প্রথম সৃষ্টি করেছিলাম, সে অবস্থায় আমরা পুনরায় তাকে ফিরিয়ে দেব। আমাদের ওয়াদা সুনিশ্চিত। আমরা তা পালন করবই।
লওহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ করার পর আমরা নাযিলকৃত কিতাবসমূহে বিধিবদ্ধ করে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মশীল মুমিন বান্দারাই কেবল (জান্নাতের) যমীনের উত্তরাধিকারী হবে।
নিশ্চয়ই এই কুরআনে পর্যাপ্ত বিষয়সমূহ রয়েছে আল্লাহ্র দাসত্বকারী সম্প্রদায়ের জন্য।
আর আমরা তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য কেবল রহমত হিসাবেই প্রেরণ করেছি।
বল, আমাকে তো কেবল এ প্রত্যাদেশই করা হয়েছে যে, তোমাদের উপাস্য মাত্র একজন। অতএব তোমরা আজ্ঞাবহ হবে কি?
এরপরেও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তুমি বল, আমি তোমাদেরকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি। আর আমি জানিনা, তোমাদেরকে যে বিষয়ের (ক্বিয়ামতের) ওয়াদা দেওয়া হয়েছে, তা নিকটবর্তী না দূরবর্তী?
তিনি জানেন যা তোমরা বল প্রকাশ্যে এবং যা তোমরা গোপন কর।
আর আমি জানিনা অবকাশ দান তোমাদের জন্য পরীক্ষা কি-না এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগের সুযোগ কি-না!
নবী বলল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি যথার্থ ফায়ছালা করে দাও। আর আমাদের প্রতিপালক তো দয়াময়। অতএব তোমরা যেসব কথা বলে থাক, তার বিরুদ্ধে তাঁর কাছেই আমাদের সকল সাহায্য প্রার্থনা।