بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
ছোয়াদ, শপথ উপদেশপূর্ণ কুরআনের।
বরং অবিশ্বাসীরা ঔদ্ধত্য ও হঠকারিতায় লিপ্ত।
এদের পূর্বে আমরা কত যুগ-সমাজকে ধ্বংস করেছি। সে সময় তারা আর্তনাদ করেছে। কিন্তু তখন তাদের বাঁচার কোন উপায় ছিল না।
আর তারা বিস্ময়বোধ করে যে, তাদের নিকট তাদের মধ্য থেকেই একজন সতর্ককারী আগমন করেছে। ফলে অবিশ্বাসীরা বলে, এ ব্যক্তি একজন জাদুকর ও মহা মিথ্যাবাদী।
সে কি বহু উপাস্যের বদলে একজন উপাস্য সাব্যস্ত করতে চায়? নিশ্চয়ই এটাতো এক বিস্ময়কর ব্যাপার।
তাদের নেতারা চলে যায় আর বলে যে, চলো তোমরা তোমাদের উপাস্যদের উপর অবিচল থাক। নিশ্চয় (তাওহীদের) এই দাওয়াতের মধ্যে কোন দূরভিসন্ধি আছে।
আমরা তো এ বিষয়ে আমাদের পূর্ববর্তী ধর্ম-সমাজে কিছুই শুনিনি। অতএব এগুলি বানোয়াট ছাড়া কিছুই নয়।
আমাদের মধ্য থেকে কেবল তারই উপর কুরআন নাযিল হ’ল? বরং তারা তো আমার কুরআনেই সন্দিহান। পরন্তু ওরা তো এখনো আমার শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করেনি।
নাকি তোমার মহা পরাক্রান্ত ও পরম দাতা প্রতিপালকের অনুগ্রহের ভান্ডার তাদের কাছেই রয়েছে?
নাকি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর উপর তাদের রাজত্ব রয়েছে? তাহ’লে তারা রশি বেয়ে আকাশে উঠুক!
তাতে তারা বিগত বাহিনীগুলির মত এখানেও হবে একটি তুচ্ছ পরাজিত বাহিনী মাত্র।
তাদের পূর্বেও রাসূলগণকে মিথ্যা বলেছিল নূহ, ‘আদ ও বহু কীলকওয়ালা ফেরাঊনের সম্প্রদায়।
আর ছিল ছামূদ, কওমে লূত ও জঙ্গলের শাস্তিপ্রাপ্ত লোকেরা। যারা ছিল বড় বড় বাহিনী।
তাদের প্রত্যেকেই রাসূলদের মিথ্যা বলেছিল। ফলে তাদের উপর শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়।
আর অবিশ্বাসীরা তো কেবল একটা নিনাদের অপেক্ষায় আছে। যখন আর দম ফেলার সুযোগও থাকবে না।
তারা (ব্যঙ্গ করে) বলে হে আমাদের পালনকর্তা! বিচার দিবসের পূর্বেই তুমি আমাদের শাস্তির অংশটুকু আমাদের দিয়ে দাও।
তাদের এমন কথায় তুমি ধৈর্য ধারণ কর। আর তুমি স্মরণ কর আমাদের শক্তিশালী বান্দা দাঊদের কথা। সে ছিল অতীব অনুগত।
আমরা পর্বতমালাকে তার বশীভূত করে দিয়েছিলাম। তারা তার সঙ্গে তাসবীহ পাঠ করত সন্ধ্যায় ও সকালে।
এবং পক্ষীকুলকেও, যারা সমবেত হ’ত। তারা সবাই ছিল তার অনুগত।
আর আমরা তার রাজত্বকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাকে দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও সারগর্ভ বাগ্মিতা।
তোমার নিকট বিবদমান ব্যক্তিদের খবর পৌঁছেছে কি? যখন তারা প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে ইবাদতখানায় প্রবেশ করেছিল।
যখন তারা দাঊদের সামনে উপস্থিত হ’ল, তখন সে এদের থেকে ভীত হয়ে পড়ল। তারা বলল, ভয় পাবেন না। আমরা দুই বিবদমান পক্ষ, পরস্পরের উপর বাড়াবাড়ি করেছি। অতএব আপনি আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করুন, অবিচার করবেন না। আপনি আমাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন!
(তারা বলল,) নিশ্চয়ই এ ব্যক্তি আমার ভাই। তার নিরানববইটি দুম্বা আছে। আর আমার আছে মাত্র একটি। তবুও সে বলে এটি আমার যিম্মায় দিয়ে দাও এবং সে আমার প্রতি কঠোর বাক্য প্রয়োগ করে।
দাঊদ বলল, সে তোমার দুম্বাটিকে তার দুম্বাদলের সাথে যুক্ত করার দাবী করে তোমার প্রতি যুলুম করেছে। শরীকদের অনেকেই পরস্পরের উপর যুলুম করে থাকে। তবে তারা ব্যতীত যারা আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্মসমূহ সম্পাদন করে। আর তারা হ’ল সংখ্যায় কম। দাঊদ ধারণা করল যে, এর দ্বারা আমরা তাকে পরীক্ষা করেছি। ফলে সে তার প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করল এবং সিজদায় পড়ে গেল ও প্রণত হ’ল। (সিজদা-১১)
অতঃপর আমরা তার ত্রুটি ক্ষমা করলাম। আর নিশ্চয়ই আমাদের কাছে তার জন্য রয়েছে নৈকট্য ও সুন্দর ঠিকানা।
হে দাঊদ! আমরা তোমাকে পৃথিবীতে শাসক নিযুক্ত করেছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে ন্যায়বিচার কর। আর তুমি প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। তাহ’লে তা তোমাকে আল্লাহ্র পথ থেকে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয়ই যারা বিচার দিবসকে ভুলে যাওয়ার কারণে আল্লাহ্র পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।
আমরা আকাশ, পৃথিবী ও এ দু’য়ের মধ্যবর্তী কোন কিছুকে বৃথা সৃষ্টি করিনি। এটি হ’ল অবিশ্বাসীদের ধারণা মাত্র। অতএব অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ!
আমরা কি তাহ’লে ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদেরকে জনপদে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ন্যায় গণ্য করব? নাকি আল্লাহভীরুদেরকে পাপাচারীদের ন্যায় গণ্য করব?
এটি এক বরকতমন্ডিত কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি। যাতে লোকেরা এর আয়াত সমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে।
আর আমরা দাঊদকে দান করেছিলাম সুলায়মান। কতই না উত্তম বান্দা ছিল সে এবং সে ছিল অতীব অনুগত।
যখন অপরাহ্নে তার সম্মুখে দ্রুতগামী অশ্বরাজিকে উপস্থিত করা হ’ল।
তখন সে বলল, আমি তো আমার প্রভুর স্মরণের জন্যই ঘোড়াগুলিকে ভালবাসি। ইতিমধ্যে সেগুলি দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেল।
অতঃপর সে বলল, তোমরা ওগুলিকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনো। অতঃপর সে তাদের পা ও গলদেশে হাত বুলাতে লাগল।
আর আমরা পরীক্ষা করেছিলাম সুলায়মানকে এবং তার আসনের উপর রেখে দিলাম একটা দেহ। অতঃপর সে প্রণত হ’ল।
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে এমন রাজত্ব দান কর, যা আমার পরে যেন আর কেউ না পায়। নিশ্চয়ই তুমি মহান দাতা।
অতঃপর আমরা বায়ুকে তার বশীভূত করে দিলাম। যা তার আদেশে প্রবাহিত হ’ত সহনীয় গতিতে যেখানে সে যেতে চাইত।
এবং শয়তানদেরকে, যারা সবাই ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী।
এবং শৃংখলে আবদ্ধ আরও অনেক শয়তানকে।
এটি আমাদের অনুগ্রহ। এক্ষণে তুমি এ থেকে কিছু দান কর বা আটকিয়ে রাখ, তাতে তোমার কোন জওয়াবদিহি নেই।
নিশ্চয়ই আমাদের নিকট তার জন্য রয়েছে নৈকট্য ও সুন্দর ঠিকানা।
আর (স্মরণ কর) আমার বান্দা আইয়ূবের কথা। যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, শয়তান আমাকে কষ্টে ও যন্ত্রণায় ফেলেছে।
(আমরা বললাম) তুমি তোমার পা দিয়ে মাটিতে আঘাত কর। অতঃপর দেখ এটি হ’ল তোমার (গোসলের) ঠান্ডা পানি এবং পানীয়।
আর আমরা তাকে প্রদান করলাম তার পরিবারবর্গ ও তাদের সাথে সমপরিমাণ, আমাদের পক্ষ হ’তে রহমত স্বরূপ এবং জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ।
আর বললাম, তুমি তোমার হাতে এক মুষ্টি তৃণশলা নাও ও তা দিয়ে (স্ত্রীকে) আঘাত কর এবং শপথ ভঙ্গ করো না (বরং পূর্ণ কর)। আমরা তাকে পেলাম ধৈর্যশীল রূপে। কতই না চমৎকার বান্দা সে! নিশ্চয়ই সে ছিল অতীব অনুগত।
আর (স্মরণ কর) আমাদের বান্দা ইব্রাহীম, ইসহাক ও ইয়াকূবের কথা। যারা ছিল শক্তিশালী ও চক্ষুষ্মান।
আমরা তাদেরকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছিলাম পরকালকে স্মরণের এক বিশেষ গুণ দ্বারা।
তারা ছিল আমাদের কাছে মনোনীত ও উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।
আর (স্মরণ কর) ইসমাঈল, আল-ইয়াসা‘ ও যুল-কিফলের কথা। তাদের প্রত্যেকে ছিল উত্তম ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত।
এই কুরআন হ’ল উপদেশ। আর নিশ্চয়ই আল্লাহভীরুদের জন্য রয়েছে সুন্দর আবাসস্থল,
চিরস্থায়ী বসবাসের জান্নাত। যার দরজাসমূহ তাদের জন্য থাকবে অবারিত।
তারা সেখানে ঠেস দিয়ে বসবে। তারা সেখানে চাইবে নানাবিধ ফল-মূল ও পানীয়।
আর তাদের নিকট থাকবে আনত নয়না সমবয়সী রমণীগণ।
এটাই হিসাব দিবসের জন্য তোমাদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি।
নিশ্চয়ই এটা আমাদের দেওয়া এমন রিযিক, যার কোন শেষ নেই।
এটি হ’ল মুত্তাক্বীদের জন্য পুরস্কার। পক্ষান্তরে অবাধ্যদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট ঠিকানা,
জাহান্নাম। যেখানে তারা প্রবেশ করবে। অতঃপর কতই না মন্দ ঠিকানা সেটি!
এটি হ’ল ফুটন্ত পানি ও জাহান্নামবাসীদের দেহ নিঃসৃত পুঁজ-রক্ত। সুতরাং তারা এর স্বাদ গ্রহণ করুক!
আরও আছে এ ধরনের নানাবিধ শাস্তি।
(জাহান্নামীরা পরস্পরে বলবে,) এই যে আরেকটি দল তোমাদের সাথে ঢুকে পড়ছে। ওদের প্রতি কোন অভিনন্দন নেই। কারণ ওরা তো জাহান্নামে প্রবেশকারী।
জবাবে প্রবেশকারীরা বলবে বরং তোমরাই (এজন্য দায়ী)। তোমাদের প্রতি কোন অভিনন্দন নেই। তোমরাই তো আমাদেরকে এ বিপদের সম্মুখীন করেছ। অতঃপর কতই না মন্দ ঠিকানা এটি!
তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! যারা আমাদেরকে এর সম্মুখীন করেছে, তুমি জাহান্নামে তাদের শাস্তি দ্বিগুণ করে দাও।
আর তারা বলবে, আমাদের কি হ’ল যে, সেই (মুমিন) লোকদের দেখছি না, যাদেরকে আমরা মন্দ লোকদের মধ্যে গণ্য করতাম!
তবে কি আমরা তাদের অহেতুক ঠাট্টার পাত্র বানিয়েছিলাম, নাকি তাদের থেকে আমাদের দৃষ্টি বিভ্রম ঘটল?
জাহান্নামীদের এই পারস্পরিক বাদানুবাদ অবশ্যই সত্য।
তুমি বল, আমি একজন সতর্ককারী বৈ কিছু নই। আর আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। যিনি এক ও মহাপরাক্রমশালী।
তিনি আসমান-যমীন ও এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর পালনকর্তা। তিনি মহা পরাক্রান্ত ও ক্ষমাশীল।
বল, এটি একটি মহা সংবাদ।
যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ।
বস্ত্তত উচ্চ মর্যাদাশীল ফেরেশতাদের বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান ছিল না, যখন তারা বাদানুবাদ করেছিল।
আমার নিকটে তো কেবল এই প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, আমি একজন স্পষ্ট সতর্ককারী বৈ কিছু নই।
(স্মরণ কর সেই সময়ের কথা) যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বলেছিলেন, আমি মাটি থেকে একজন মানুষ সৃষ্টি করব।
অতঃপর যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তাতে আমার সৃষ্ট রূহ ফুঁকে দিব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদা করো।
তখন ফেরেশতারা সবাই একযোগে সিজদা করল,
ইবলীস ব্যতীত। সে দম্ভ করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।
আল্লাহ বললেন, হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু’হাত দিয়ে সৃষ্টি করেছি, তাকে সিজদা করতে কোন বস্ত্ত তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহংকার করলে, নাকি তুমি তার চাইতে বড় হয়ে গেলে?
সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।
আল্লাহ বললেন, তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও! কারণ তুমি বিতাড়িত।
আর তোমার উপর আমার অভিশাপ রইল বিচার দিবস পর্যন্ত।
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! তাহ’লে আপনি আমাকে অবকাশ দিন পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।
তিনি বললেন, বেশ! তোমাকে অবকাশ দেওয়া হ’ল,
অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত।
সে বলল, আপনার ইয্যতের কসম! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করব।
তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দারা ব্যতীত।
তিনি বললেন, হ্যাঁ, এটাই সত্য। আর সত্যই আমি বলে থাকি।-
অবশ্যই আমি জাহান্নাম পূর্ণ করব তোমাকে দিয়ে ও তাদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে তাদের সবাইকে দিয়ে।
(হে নবী!) তুমি বলে দাও যে, আমি তোমাদের নিকট কোনরূপ বিনিময় চাই না এবং আমি ভানকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই।
এ কুরআন তো জগদ্বাসীর জন্য উপদেশ মাত্র।
আর নিশ্চয়ই তোমরা কিছুকাল পরেই এর খবরের সত্যতা জানতে পারবে।