بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
হা-মীম।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু (আল্লাহ্র) পক্ষ হ’তে পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ।
এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে আরবী কুরআন রূপে। যার আয়াত সমূহ জ্ঞানীদের জন্য বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।
(যা এসেছে) সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ মুখ ফিরিয়ে নিল। বস্ত্তত ওরা শোনেনা।
তারা বলে, তুমি যে বিষয়ের দিকে আমাদের আহবান করছ, সে বিষয়ে আমাদের অন্তরগুলি আবরণে আচ্ছাদিত। আমাদের কর্ণে রয়েছে বধিরতা। আর আমাদের ও তোমার মাঝে রয়েছে (শিরকের) পর্দা। অতএব তুমি তোমার (রবের) কাজ করে যাও, আমরা আমাদের (উপাস্যের) কাজ করে যাই।
বল আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ বৈ কিছু নই। আমার নিকট প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, তোমাদের উপাস্য মাত্র একজন। অতএব তোমরা তার প্রতি দৃঢ় থাক এবং তার নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর দুর্ভোগ হ’ল মুশরিকদের জন্য।
যারা যাকাত দেয় না এবং যারা পরকালে অবিশ্বাসী।
নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম সমূহ সম্পাদন করে, তাদের জন্য রয়েছে অবিচ্ছিন্ন পুরস্কার।
বল, তোমরা কি সেই সত্তাকে অস্বীকার কর, যিনি পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন দু’দিনে এবং তোমরা তার জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ কর? তিনিই তো জগৎসমূহের প্রতিপালক।
তিনি পৃথিবীর উপরিভাগে পর্বতমালা স্থাপন করেছেন ও তাতে কল্যাণ দান করেছেন। আর তাতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন চার দিনে সমভাবে, (যা বর্ণিত হ’ল) জিজ্ঞাসুদের জন্য।
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধূম্রকুঞ্জ। অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে এসো ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা এলাম স্বেচ্ছায় অনুগত হয়ে।
অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলীকে সপ্ত আকাশে পরিণত করলেন দু’দিনে এবং প্রত্যেক আকাশে তার নির্দেশ প্রেরণ করলেন। আর আমরা দুনিয়ার আকাশকে নক্ষত্ররাজি দিয়ে সুশোভিত করলাম এবং তাকে করলাম (পৃথিবীর জন্য) রক্ষাব্যুহ। বস্ত্তত এটি হ’ল মহা পরাক্রান্ত ও মহা বিজ্ঞ আল্লাহ্র ব্যবস্থাপনা।
অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহ’লে তুমি বল, আমি তোমাদের ধ্বংসের ব্যাপারে সতর্ক করছি, ‘আদ ও ছামূদের ধ্বংসের ন্যায়।
(স্মরণ কর) যখন তাদের নিকট ও তাদের পূর্ববর্তীদের নিকট রাসূলগণ এসেছিলেন এই দাওয়াত নিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারু ইবাদত করো না। তারা বলেছিল, আমাদের পালনকর্তা চাইলে অবশ্যই ফেরেশতা নাযিল করতেন। অতএব তোমরা যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ, তা আমরা প্রত্যাখ্যান করলাম।
অতঃপর ‘আদ সম্প্রদায়! তারা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করেছিল এবং বলেছিল, আমাদের চাইতে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে? অথচ তারা কি বুঝে না যে, আল্লাহ যিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী। এরপরেও তারা আমাদের আয়াত সমূহকে অস্বীকার করত।
অতঃপর আমরা তাদের উপর প্রেরণ করলাম প্রচন্ড ঝঞ্ঝাবায়ু কয়েকটি অশুভ দিনে। যাতে আমরা তাদের পার্থিব জীবনে হীনকর শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাতে পারি। আর আখেরাতের শাস্তি তো আরও লাঞ্ছনাকর। সেদিন তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।
অতঃপর ছামূদ সম্প্রদায়! তাদেরকে আমরা পথপ্রদর্শন করেছিলাম। কিন্তু তারা হেদায়াতের উপরে অন্ধত্বকে পসন্দ করল। ফলে তাদের কৃতকর্মের অপমানজনক শাস্তির নিনাদ তাদেরকে পাকড়াও করল।
আর আমরা রক্ষা করলাম তাদেরকে যারা ঈমান এনেছিল এবং আল্লাহভীরুতা অবলম্বন করেছিল।
আর যেদিন আল্লাহ্র শত্রুদের সমবেত করা হবে ও দলে দলে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নেওয়া হবে।
অবশেষে যখন তারা জাহান্নামের নিকটে এসে যাবে, তখন তাদের কান, চোখ ও ত্বক তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দিবে।
আর তারা তাদের ত্বককে বলবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে কেন সাক্ষ্য দিচ্ছ? তারা বলবে, আল্লাহ আমাদের বাকশক্তি দান করেছেন। যিনি সবকিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনিই তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা তারই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।
তোমাদের কান, চোখ ও ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেনা ভেবেই তোমরা তাদের কাছ থেকে কিছুই গোপন করতে না। বরং তোমরা ধারণা করেছিলে যে, তোমরা যা কর তার অনেক কিছুই আল্লাহ জানেন না।
তোমাদের পালনকর্তা সম্পর্কে এই ভুল ধারণাই তোমাদের ধ্বংস করেছে। ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছ।
অতঃপর যদি তারা ধৈর্য ধারণ করে, তবু জাহান্নামই তাদের ঠিকানা। আর যদি অনুতপ্ত হয়, তবু তাদের ওযর কবুল করা হবে না।
আর আমরা তাদের জন্য নিযুক্ত করেছিলাম কতক সহচরকে। যারা তাদের আগে-পরের সব কর্মকে তাদের জন্য শোভনীয় করে দেখিয়েছিল। ফলে তাদের উপর শাস্তি অবধারিত হয়ে গেল। যেরূপ হয়েছিল তাদের পূর্ববর্তী কিছু জিন ও ইনসানের উপর। বস্ত্তত তারা ছিল ক্ষতিগ্রস্ত।
আর কাফেররা বলে, তোমরা এ কুরআন শ্রবণ করো না। বরং সেসময় হট্টগোল কর। যাতে তোমরা জয়ী হ’তে পার।
অতএব আমরা অবশ্যই অবিশ্বাসীদের কঠিন শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাবো এবং আমরা অবশ্যই তাদের কৃতকর্মের নিকৃষ্টতম বদলা দেব।
ওটা হ’ল আল্লাহ্র শত্রুদের বদলা, জাহান্নাম। তাদের জন্য সেখানে রয়েছে চিরস্থায়ী আবাসগৃহ, আমাদের আয়াত সমূহকে অস্বীকার করার প্রতিফল স্বরূপ।
(সেদিন) অবিশ্বাসীরা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! যেসব জিন ও ইনসান আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদেরকে দেখিয়ে দাও। তাদেরকে আমরা পদদলিত করব। যাতে তারা অপদস্থদের অন্তর্ভুক্ত হয়।
নিশ্চয়ই যারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। অতঃপর তার উপর দৃঢ় থাকে, তাদের উপর ফেরেশতামন্ডলী নাযিল হয় এবং বলে যে, তোমরা ভয় পেয়ো না ও চিন্তান্বিত হয়ো না। আর তোমরা জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল।
আমরা তোমাদের বন্ধু ইহকালে ও পরকালে। আর সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমাদের মন চাইবে এবং সেখানে রয়েছে যা তোমরা দাবী করবে।
এটা হবে ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালুর পক্ষ হ’তে আপ্যায়ন।
ঐ ব্যক্তির চাইতে কথায় উত্তম আর কে আছে, যে (মানুষকে) আল্লাহ্র দিকে ডাকে ও নিজে সৎকর্ম করে এবং বলে, নিশ্চয়ই আমি আজ্ঞাবহদের অন্তর্ভুক্ত।
ভাল ও মন্দ কখনো সমান নয়। তুমি উত্তম দ্বারা (অনুত্তমকে) প্রতিহত কর। ফলে তুমি দেখবে যে, তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে যেন (তোমার) অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে।
এই গুণের অধিকারী কেবল তারাই হ’তে পারে, যারা ধৈর্যশীল এবং এই গুণের অধিকারী কেবল তারাই হ’তে পারে, যারা মহা ভাগ্যবান।
আর যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
বস্ত্তত তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে রাত্রি, দিন, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা করো না এবং চন্দ্রকেও নয়। বরং তোমরা সিজদা কর আল্লাহকে, যিনি এগুলিকে সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত করে থাক।
অতঃপর যদি তারা অহংকার করে, তবে যারা তোমার প্রতিপালকের সান্নিধ্যে রয়েছে, তারাই তো (অর্থাৎ ফেরেশতাগণ) দিবারাত্রি তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং তারা ক্লান্ত হয় না। (সিজদা-১২)
আর তাঁর নিদর্শন সমূহের অন্যতম হ’ল, তুমি ভূমিকে দেখতে পাও শুষ্ক রূপে। অতঃপর যখন আমরা তার উপর বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন সেটি স্পন্দিত হয় ও স্ফীত হয়। এভাবে যিনি ওটাকে জীবিত করেন, তিনি অবশ্যই মৃতদের জীবিতকারী। নিশ্চয়ই তিনি সকল কিছুর উপরে সর্বশক্তিমান।
যারা আমাদের আয়াত সমূহে বিকৃতি ঘটায়, তারা আমাদের অগোচরে নয়। তাহ’লে কি যে ব্যক্তি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, সেই-ই উত্তম, নাকি যে ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন নিরাপদে আসবে (সেই-ই উত্তম?)। তোমরা যা খুশী কর। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর সবই তিনি দেখেন।
নিশ্চয়ই যারা তাদের নিকটে কুরআন আসার পর তা প্রত্যাখ্যান করে (তারা ধ্বংস হবে)। নিঃসন্দেহে এটি মহা পরাক্রান্ত এক কিতাব।
এতে কোন মিথ্যা প্রবেশ করে না সম্মুখ হ’তে বা পশ্চাত হ’তে। এটি মহা প্রজ্ঞাময় ও প্রশংসিত সত্তার পক্ষ হ’তে পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ।
তোমাকে এমন কোন কথা বলা হচ্ছে না, যা তোমার পূর্ববর্তী রাসূলদের বলা হয়নি। (তবে জেনে রেখ) নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল ও মর্মন্তুদ শাস্তিদাতা।
যদি আমরা একে অনারব কুরআন বানাতাম, তাহ’লে ওরা বলত যদি এর আয়াতগুলি (আমাদের ভাষায়) ব্যাখ্যা করা হ’ত! কি আশ্চর্য! কুরআন অনারব, আর রাসূল আরবী? বলে দাও, এটি বিশ্বাসীদের জন্য পথনির্দেশ ও আরোগ্য। আর যারা অবিশ্বাসী, তাদের কর্ণে রয়েছে বধিরতা এবং কুরআন তাদের উপর অন্ধত্ব (অর্থাৎ অন্ধকার)। তাদেরকে যেন বহু দূর থেকে আহবান করা হচ্ছে।
আর নিশ্চয়ই আমরা মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম। অতঃপর তারা তাতে মতভেদ করেছিল। যদি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকত, তাহ’লে তাদের মধ্যে (শাস্তির) ফায়ছালা হয়ে যেত। বস্ত্তত ওরা কুরআন সম্বন্ধে সন্দেহে দোদুল্যমান রয়েছে।
যে ব্যক্তি সৎকর্ম করে, সে তার নিজের জন্যই সেটা করে। আর যে ব্যক্তি অসৎকর্ম করে তার প্রতিফল তার উপরেই বর্তাবে। বস্ত্তত তোমার প্রতিপালক তার বান্দাদের উপর অত্যাচারী নন।
তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয় ক্বিয়ামতের জ্ঞান। বস্ত্তত কোন ফল তার আবরণ ভেদ করে বের হয় না এবং কোন নারী গর্ভধারণ করে না বা প্রসব করে না তাঁর গোচরে ব্যতীত। আর (স্মরণ কর) যেদিন আল্লাহ তাদের ডেকে বলবেন, আমার শরীকরা কোথায়? তারা বলবে, আমরা তো আপনাকে জানিয়ে দিয়েছি যে, আমাদের মধ্যে কেউ আপনার (কোন শরীকের) পক্ষে সাক্ষ্যদাতা নেই।
ইতিপূর্বে তারা যাদের আহবান করত, তারা তাদের থেকে উধাও হয়ে যাবে এবং তারা নিশ্চিত হবে যে, এখন আর তাদের পালাবার কোন পথ নেই।
মানুষ কল্যাণ প্রার্থনায় শ্রান্ত হয় না। কিন্তু যদি তাকে কোনরূপ অকল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে (দো‘আ কবুলে) হতাশ ও (আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভে) নিরাশ হয়ে পড়ে।
আর যদি আমরা বিপদ স্পর্শ করার পর তাকে কোন অনুগ্রহের স্বাদ আস্বাদন করাই, তখন সে অবশ্যই বলবে, এটা তো আমারই প্রাপ্য। আর আমি বিশ্বাস করিনা যে, ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। তবে যদি আমাকে আমার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়েও নেওয়া হয়, তথাপি সেখানে আমার জন্য অবশ্যই কল্যাণ থাকবে। অতএব অবশ্যই আমরা অবিশ্বাসীদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করব এবং অবশ্যই তাদেরকে কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।
যখন আমরা মানুষের উপর অনুগ্রহ করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও দূরে সরে যায়। আর যখন তাকে মন্দ স্পর্শ করে, তখন সে দীর্ঘ প্রার্থনায় রত হয়।
তুমি বল, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, যদি এই কুরআন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে হয়, আর তোমরা তা অস্বীকার কর, তাহ’লে তার চাইতে বড় পথভ্রষ্ট আর কে হবে, যে দূরতম হঠকারিতায় লিপ্ত?
সত্বর আমরা তাদেরকে আমাদের নিদর্শন সমূহ দেখাবো সর্বত্র এবং তাদের নিজেদের মধ্যে। যাতে তাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআন সত্য। আর তোমার প্রতিপালকের জন্য এটাই কি যথেষ্ট নয় যে, তিনি সকল বিষয়ে সাক্ষী?
জেনে রাখ, এরা তাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দেহে রয়েছে। জেনে রাখ, তিনি সবকিছুকেই বেষ্টন করে আছেন।