بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
ত্বোয়া সীম মীম।
এগুলি সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত।
আমরা তোমার নিকট মূসা ও ফেরাঊনের কিছু বৃত্তান্ত বর্ণনা করব যথার্থভাবে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য।
ফেরাঊন তার দেশে উদ্ধত হয়েছিল এবং সে তার দেশবাসীকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে তাদের মধ্যকার একটি দলকে দুর্বল করতে চেয়েছিল। সে তাদের পুত্রসন্তানদের যবহ করত এবং কন্যা সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখত। নিশ্চয়ই সে ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
আর আমরা ইচ্ছা করলাম তাদের প্রতি অনুগ্রহ করব যাদেরকে দেশে দুর্বল করতে চাওয়া হয়েছিল এবং তাদেরকে নেতা বানাবো ও তাদেরকে দেশের উত্তরাধিকারী করব।
আর তাদেরকে দেশের ক্ষমতায় আসীন করব এবং ফেরাঊন, হামান ও তাদের সেনাবাহিনীকে সেটা দেখিয়ে দেব। যেটা তারা সেই দুর্বল দলের পক্ষ থেকে আশংকা করত (অর্থাৎ শাসনক্ষমতা হারানোর ভয়)।
আর আমরা মূসার মায়ের নিকট ‘ইলহাম’ করলাম যে, তুমি তাকে দুধ পান করাতে থাক। অতঃপর যখন তার সম্পর্কে বিপদের আশংকা করবে, তখন তাকে সাগরে নিক্ষেপ কর। আর এতে তুমি ভয় করোনা এবং চিন্তা করোনা। আমরা তাকে তোমার নিকট ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত করব।
অতঃপর ফেরাঊনের পরিবার তাকে কুড়িয়ে নিল। যাতে (পরবর্তীতে) সে তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়। নিশ্চয়ই ফেরাঊন, হামান ও তাদের সেনাবাহিনী সকলেই ছিল অপরাধী।
ফেরাঊনের স্ত্রী বলল, এ শিশু আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী। তোমরা একে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা একে সন্তান হিসাবেও গ্রহণ করতে পারি। বস্ত্তত তারা (আল্লাহ্র কৌশল) বুঝতে পারেনি।
ওদিকে মূসার মায়ের মন অস্থির হয়ে উঠল। সে তার বিষয়টি প্রকাশ করেই ফেলত, যদি না আমরা তার হৃদয়কে দৃঢ় রাখতাম। যাতে সে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত থাকে।
সে মূসার বোনকে বলল, তুমি তার অনুসরণ কর। এভাবে সে তাদের অজ্ঞাতসারে দূর থেকে তাকে দেখে যেতে লাগল।
আর আমরা তাকে তার মায়ের কাছে ফিরানোর পূর্ব পর্যন্ত ধাত্রীস্তন্য পানে বিরত রাখলাম। এ সময় তার বোন তাদের বলল, আমি কি তোমাদের এমন এক পরিবারের সন্ধান দিব যারা তোমাদের জন্য একে লালন-পালন করবে এবং তারা হবে তার মঙ্গলকামী?
অতঃপর (এভাবে) আমরা তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম যাতে তার চক্ষু শীতল হয় এবং সে চিন্তা না করে। আর সে এটা জেনে নেয় যে, আল্লাহ্র ওয়াদা সত্য। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানেনা।
অতঃপর যখন মূসা যৌবনে পদার্পণ করল এবং পূর্ণ বয়স্ক হ’ল, তখন আমরা তাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম। আর এভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি।
আর মূসা শহরে প্রবেশ করল তার অধিবাসীদের (দুপুরের) বিশ্রামকালে। সেখানে সে দু’জন লোককে লড়াইরত দেখল। তাদের একজন ছিল তার নিজ গোত্রের। অপরজন ছিল তার শত্রু গোত্রের। অতঃপর নিজ গোত্রের লোকটি তার নিকটে তার শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য চাইল। তখন মূসা তাকে ঘুষি মারল। তাতেই সে অক্কা পেল। মূসা বলল, এটি শয়তানের কাজ। নিশ্চয়ই সে (মানুষের) প্রকাশ্য শত্রু ও পথভ্রষ্টকারী।
সে বলল, হে আমার পালনকর্তা! আমি আমার নিজের উপর যুলুম করেছি। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা কর! তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি তো ক্ষমাশীল ও দয়াবান।
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! যেহেতু তুমি আমার উপর অনুগ্রহ করেছ, সেহেতু আমি কখনোই অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না।
অতঃপর মূসা শংকিত অবস্থায় সকালে শহরে বের হ’ল (গতকালের ঘটনা বিষয়ে) তথ্য সংগ্রহের জন্য। তখন সে দেখল যে, আগের দিনের সেই (ইস্রাঈলী) ব্যক্তিটি আজ আবার সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে। মূসা তাকে বলল, নিশ্চয়ই তুমি একটা স্পষ্ট নির্বোধ লোক।
অতঃপর মূসা যখন তার ও তার নিকট সাহায্যপ্রার্থী উভয়ের শত্রু (ক্বিবতী)-কে ধরতে উদ্যত হ’ল, তখন (দুর্বল ইস্রাঈলী) বলে উঠল, গতকাল তুমি যেমন একজনকে হত্যা করেছ, তেমনি আমাকেও কি (আজ) হত্যা করতে চাও? তুমি তো কেবল জনপদে স্বৈরাচারী হ’তে চাও, শান্তিকামী হ’তে চাওনা।
এ সময় নগরীর দূর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি ছুটে আসল এবং বলল, হে মূসা! ফেরাঊনের পারিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার জন্য শলা-পরামর্শ করছে। অতএব তুমি বেরিয়ে যাও। নিশ্চয়ই আমি তোমার একজন শুভাকাংখী।
অতঃপর মূসা সেখান থেকে ভীত ও সতর্ক অবস্থায় বের হয়ে গেল এবং বলল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা কর।
অতঃপর যখন সে মাদিয়ান অভিমুখে রওয়ানা হ’ল, তখন বলল, নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করবেন!
অতঃপর যখন সে মাদিয়ানে এক কূয়ার নিকটে পৌঁছল, তখন সেখানে একদল লোককে তাদের পশুপালকে পানি পান করাতে দেখল। আর দেখল তাদের পিছনে দু’জন নারীকে তাদের পশুগুলিকে সামলিয়ে রাখতে। মূসা তাদের কাছে গিয়ে বলল, তোমাদের কি অবস্থা? তারা বলল, আমরা পানি পান করাতে পারছিনা যতক্ষণ না রাখালরা সরে যায়। অথচ আমাদের পিতা অতিশয় বৃদ্ধ মানুষ।
তখন মূসা তাদের গবাদিপশু গুলিকে পানি পান করালো। অতঃপর ছায়ার নীচে ফিরে গেল এবং বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার পক্ষ হ’তে আমার প্রতি কল্যাণ নাযিলের মুখাপেক্ষী।
অতঃপর উক্ত নারীদ্বয়ের একজন তার কাছে এসে সলজ্জভাবে বলল, আমার আববা আপনাকে ডেকেছেন, যাতে আপনি আমাদের পশুগুলিকে যে পানি পান করিয়েছেন, তার বিনিময় দিতে পারেন। তখন মূসা তার নিকটে গেল ও তাকে সব ঘটনা খুলে বলল। (জবাবে) তিনি বললেন, ভয় পেয়োনা। তুমি যালেম সম্প্রদায়ের হাত থেকে বেঁচে গেছ।
অতঃপর তাদের একজন বলল, হে পিতা! একে কর্মচারী নিযুক্ত করুন! নিশ্চয়ই আপনার কর্মসহায়ক হিসাবে সেই ব্যক্তি উত্তম হবে, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।
তখন পিতা মূসাকে বললেন, আমি আমার এই মেয়ে দু’টির একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার (বাড়ীতে) কর্মচারী হিসাবে থাকবে। তবে যদি দশ বছর পূর্ণ কর, সেটা তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনা। আল্লাহ চাহেন তো তুমি আমাকে সদাচরণকারীদের মধ্যে পাবে।
মূসা বলল, আমার ও আপনার মধ্যে উক্ত চুক্তিই রইল। দু’টি মেয়াদের যেকোন একটি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে আপনার কোন অভিযোগ থাকবে না। আর আমরা যা বলছি, আল্লাহ তার উপরে তত্ত্বাবধায়ক।
অতঃপর মূসা যখন মেয়াদ পূর্ণ করল এবং সপরিবারে (মিসর) যাত্রা করল, তখন সে (ডানপাশে) তূর পাহাড়ের দিক থেকে আগুন দেখতে পেল। সে তার পরিবারবর্গকে বলল, তোমরা অপেক্ষা কর আমি আগুন দেখেছি। সম্ভবত আমি সেখান থেকে (মিসর যাওয়ার পথের) সন্ধান নিয়ে আসতে পারব অথবা কোন জ্বলন্ত অঙ্গার নিয়ে আসতে পারব যা দিয়ে তোমরা আগুন পোহাতে পারবে।
অতঃপর যখন সে তার কাছে পৌঁছল, তখন ডান পাশের উপত্যকার প্রান্তভাগের পবিত্র ভূখন্ডের একটি বৃক্ষ থেকে আহবান করা হ’ল, হে মূসা! নিশ্চয় আমি আল্লাহ, জগত সমূহের প্রতিপালক।
তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে লাঠিটিকে সাপের মত দৌড়াদৌড়ি করতে দেখল, তখন সে (ভয়ে) পিঠ ফিরিয়ে চলে এল এবং পিছন ফিরে তাকাল না। বলা হ’ল হে মূসা! এগিয়ে যাও। ভয় পেয়ো না। নিশ্চয়ই তুমি নিরাপদ।
তোমার হাত বগলে রাখ। দেখবে তা বেরিয়ে আসবে নির্মল আলো হয়ে। আর তোমার দু’হাত নিজের দিকে চেপে ধর ভয় দূর করার জন্য। এ দু’টি ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গের প্রতি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে প্রমাণ স্বরূপ। নিশ্চয়ই তারা পাপাচারী সম্প্রদায়।
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তাদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলাম। ফলে আমি ভয় পাচ্ছি যে, তারা আমাকে হত্যা করবে।
আর আমার (বড়) ভাই হারূণ, সে আমার চাইতে প্রাঞ্জলভাষী। অতএব তাকে আমার সাথে সাহায্যের জন্য প্রেরণ করুন যাতে সে আমাকে সত্যায়ন করে। কেননা আমি আশংকা করছি যে তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।
আল্লাহ বললেন, সত্বর আমরা তোমার বাহুকে শক্তিশালী করব তোমার ভাইয়ের মাধ্যমে এবং তোমাদের দু’জনকে এমন কর্তৃত্ব দেব যে, ওরা তোমাদের কাছে পৌঁছতে পারবে না আমাদের দেওয়া নিদর্শন সমূহের কারণে। তোমরা ও তোমাদের অনুসারীরা বিজয়ী থাকবে।
অতঃপর যখন মূসা তাদের কাছে আমাদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে পৌঁছল, তখন তারা বলল, এটি অলীক জাদু ব্যতীত কিছু নয়। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে এরূপ কথা কখনো শুনিনি।
মূসা বলল, আমার প্রতিপালক সর্বাধিক অবগত, কে তাঁর নিকট থেকে হেদায়াত নিয়ে এসেছে এবং কার জন্য রয়েছে আখেরাতের শুভ পরিণাম। আর এটা নিশ্চিত যে, যালেমরা সফলকাম হবেনা।
ফেরাঊন বলল, হে পারিষদবর্গ! আমি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন উপাস্য আছে বলে আমি জানিনা। সুতরাং হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং এমন একটি (সুউচ্চ) প্রাসাদ নির্মাণ কর, যা থেকে আমি মূসার উপাস্যকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। আর আমি অবশ্যই তাকে মিথ্যাবাদী বলে মনে করি।
এভাবে ফেরাঊন ও তার বাহিনী অন্যায়ভাবে জনপদে ঔদ্ধত্য দেখাতে লাগল। আর ধারণা করল যে, তারা কখনো আমাদের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না।
ফলে আমরা তাকে ও তার বাহিনীকে পাকড়াও করলাম এবং তাদেরকে সাগরে নিক্ষেপ করলাম। অতএব তুমি দেখ যালেমদের পরিণতি কেমন হয়েছে।
আমরা তাদেরকে নেতা করেছিলাম। অথচ তারা মানুষকে জাহান্নামের দিকে ডাকতো। ফলে ক্বিয়ামতের দিন তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।
এ দুনিয়ায় আমরা তাদের পিছনে অভিসম্পাৎ লাগিয়ে দিয়েছি। আর ক্বিয়ামতের দিন তারা হবে ঘৃণিতদের অন্তর্ভুক্ত।
আর নিশ্চয়ই আমরা তো পূর্ববর্তী বহু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার পর মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম মানুষের জন্য জ্ঞানবর্তিকা, পথনির্দেশ ও অনুগ্রহ হিসাবে। যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।
আর তুমি তো (তূর পাহাড়ের) পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত ছিলে না, যখন আমরা মূসাকে নির্দেশনামা দিয়েছিলাম। আর তুমি তো প্রত্যক্ষদর্শী ছিলে না।
বস্ত্তত আমরা বহু যুগ-সম্প্রদায়কে সৃষ্টি করেছিলাম। অতঃপর তাদের উপর দীর্ঘ যুগ অতিবাহিত হয়েছে। আর তুমি মাদিয়ানবাসীদের মধ্যে বসবাসকারী ছিলে না যে, তুমি তাদেরকে আমাদের আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাবে। কিন্তু আমরাই তো ছিলাম রাসূল প্রেরণকারী।
আর তুমি তূর পাহাড়ের পাশে ছিলে না যখন আমরা আহবান করি। কিন্তু এটি ছিল তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে তোমার জন্য রহমত স্বরূপ। যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পার, যাদের কাছে তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি। যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।
আর (এটা এজন্য যে,) তাদের কৃতকর্মের দরুন তাদের উপর কোন গযব নাযিল হ’লে তারা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি যদি আমাদের নিকট কোন রাসূল প্রেরণ করতে, তাহ’লে আমরা তোমার আয়াতসমূহের অনুসরণ করতাম এবং আমরা ঈমানদারগণের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম।
অতঃপর যখন তাদের কাছে আমাদের পক্ষ থেকে সত্য (কুরআন) এসে গেল, তখন তারা বলল, মূসাকে যেমন (নিদর্শন) দেওয়া হয়েছিল, (মুহাম্মাদকে) সেরূপ দেওয়া হ’ল না কেন? অথচ ইতিপূর্বে মূসাকে এরূপ দেওয়ার পরেও কি তারা তাকে অস্বীকার করেনি? তারা বলেছিল, (মূসা ও হারূণ) দু’জনেই জাদুকর, পরস্পরের সহযোগী। আর তারা বলেছিল, আমরা প্রত্যেককে অস্বীকার করি।
তুমি বল, বেশ তাহ’লে তোমরা আল্লাহ্র নিকট থেকে এমন একটি কিতাব নিয়ে এস যা এদু’টির (তাওরাত ও কুরআনের) চাইতে উত্তম পথ প্রদর্শনকারী হবে? আমি তা অনুসরণ করব, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (চ্যালেঞ্জ-৫)
অতঃপর যদি তারা তোমার ডাকে সাড়া না দেয় তবে জেনে রাখ যে, তারা কেবল তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র হেদায়াতকে অগ্রাহ্য করে নিজের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, তার চাইতে বড় পথভ্রষ্ট আর কে আছে? নিশ্চয়ই আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না।
আর আমরা তো তাদের কাছে নিয়মিতভাবে বাণী পৌঁছে দিয়েছি। যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।
এর পূর্বে আমরা যাদের কিতাব দিয়েছিলাম, তারা এতে (কুরআনে) বিশ্বাস স্থাপন করে।
যখন তাদের নিকট এটি পাঠ করা হয়, তখন তারা বলে আমরা এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম। এটা আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে আগত সত্যবাণী। আর আমরা ইতিপূর্বেও আজ্ঞাবহ ছিলাম।
তারা দ্বিগুণ পুরস্কারপ্রাপ্ত হবে তাদের ধৈর্যের কারণে। তারা ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে এবং আমরা তাদেরকে যা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।
তারা যখন অসার বাক্য শ্রবণ করে তখন তা উপেক্ষা করে ও বলে, আমাদের কর্মফল আমাদের এবং তোমাদের কর্মফল তোমাদের। তোমাদের প্রতি সালাম (অর্থাৎ পরিত্যাগ)। আমরা মূর্খদের সাথে জড়াতে চাই না।
নিশ্চয়ই তুমি হেদায়াত করতে পারো না যাকে তুমি ভালবাস। বরং আল্লাহই যাকে চান তাকে হেদায়াত করে থাকেন। আর তিনিই হেদায়াত প্রাপ্তদের সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত।
তারা বলে যদি আমরা তোমার সাথে হেদায়াতের পথ অনুসরণ করি, তাহ’লে আমাদেরকে আমাদের জনপদ থেকে উৎখাত করা হবে। (আল্লাহ বলেন), আমরা কি তাদের জন্য একটি নিরাপদ ‘হারাম’ প্রতিষ্ঠা করিনি? যেখানে সকল প্রকার ফল-ফলাদি আমদানী হয় আমাদের পক্ষ থেকে দেওয়া রিযিক স্বরূপ। কিন্তু তাদের অধিকাংশ এটা জানে না।
কত জনপদকে আমরা ধ্বংস করেছি যার অধিবাসীরা তাদের ধন-সম্পদের বড়াই করত। ঐ যে তাদের ঘর-বাড়ী! তাদের পরে কেউ সেখানে বসবাস করেনা কদাচিৎ কিছু লোক ব্যতীত। অবশেষে আমরাই সবকিছুর মালিক হয়েছি।
আর তোমার প্রতিপালক কোন জনপদকে ধ্বংস করেন না যতক্ষণ না তার কেন্দ্রস্থলে কোন রাসূল প্রেরণ করেন। যিনি তাদের নিকট আমাদের আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনান। আর আমরা কোন জনপদকে ধ্বংস করিনা যতক্ষণ না তার অধিবাসীরা সীমালংঘনকারী হয়।
তোমাদের যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্ত্ত ও শোভা মাত্র। আর আল্লাহ্র কাছে যা রয়েছে, তা উত্তম ও চিরস্থায়ী। এরপরেও কি তোমরা অনুধাবন করবে না?
যাকে আমরা উত্তম পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যা সে পাবে। সে কি ঐ ব্যক্তির ন্যায় হবে, যাকে আমরা পার্থিব জীবনের ভোগ-সম্ভার দিয়েছি। অতঃপর যাকে ক্বিয়ামতের দিন (শাস্তির জন্য) হাযির করা হবে?
সেদিন তিনি তাদেরকে আহবান করে বলবেন, কোথায় আমার সেই শরীকরা, যাদেরকে তোমরা ধারণা করতে?
সেদিন যাদের উপর শাস্তি অবধারিত হবে তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! ওদেরকে আমরা পথভ্রষ্ট করেছিলাম। আমরা ওদের পথভ্রষ্ট করেছিলাম, যেমন আমরাও পথভ্রষ্ট হয়েছিলাম। আমরা তোমার নিকট ওদের ব্যাপারে দায়মুক্ত হচ্ছি। ওরা কেবল আমাদেরই পূজা করত না (বরং ওরা ওদের খেয়াল-খুশীর তাবেদারী করত)।
বলা হবে, তোমরা তোমাদের শরীকদের আহবান কর। তখন তারা তাদের আহবান করবে। কিন্তু তারা তাতে সাড়া দিবে না বরং তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে (এবং বলবে) হায়! যদি তারা (দুনিয়াতে) হেদায়াতপ্রাপ্ত হ’ত!
সেদিন আল্লাহ তাদের ডেকে বলবেন, নবীদের আহবানে তোমরা কিরূপ সাড়া দিয়েছিলে?
কিন্তু সেদিন তাদের সব যুক্তি-প্রমাণ হারিয়ে যাবে। ফলে তারা পরস্পরকে জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারবে না।
তবে যে ব্যক্তি তওবা করেছিল ও বিশ্বাসী হয়েছিল এবং সৎকর্ম করেছিল, সে অবশ্যই সফলকামদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আর তোমার প্রতিপালক যা চান তাই সৃষ্টি করেন এবং যাকে চান মনোনীত করেন। এতে তাদের কোনই হাত নেই। আল্লাহ পবিত্র এবং তারা যাদের শরীক করে, তাদের থেকে বহু ঊর্ধ্বে।
আর তোমার প্রতিপালক জানেন যা তারা তাদের অন্তর সমূহে গোপন করে এবং যা তারা প্রকাশ করে।
আর তিনিই আল্লাহ। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তার জন্যই সকল প্রশংসা দুনিয়া ও আখেরাতে। তারই জন্য সকল কর্তৃত্ব এবং তার দিকেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।
তুমি বল, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, যদি আল্লাহ রাত্রিকে তোমাদের উপর ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তাহ’লে আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন উপাস্য আছে কি, যে তোমাদের নিকট সূর্যকিরণ এনে দিবে? এরপরেও কি তোমরা শুনবে না?
বল, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, যদি আল্লাহ দিবসকে তোমাদের উপর ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তাহ’লে আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন উপাস্য আছে কি, যে তোমাদের নিকট রাত্রি এনে দিবে, যেখানে তোমরা বিশ্রাম নিবে? এরপরেও কি তোমরা ভেবে দেখবে না?
আর তিনিই স্বীয় অনুগ্রহে তোমাদের জন্য রাত্রি ও দিন সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা সেখানে বিশ্রাম নিতে পার ও তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।
সেদিন তিনি তাদেরকে আহবান করে বলবেন, কোথায় আমার সেই শরীকরা, যাদেরকে তোমরা ধারণা করতে?
আর আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন (নবীকে) সাক্ষী হিসাবে বের করে আনব। অতঃপর আমরা মিথ্যাবাদীদের বলব, তোমরা তোমাদের (শিরকের পক্ষে) প্রমাণ উপস্থিত কর। তখন তারা (তাতে ব্যর্থ হয়ে) জানতে পারবে যে, সত্য কেবল আল্লাহ্রই জন্য (অর্থাৎ উপাস্য কেবল আল্লাহই)। আর তারা (শিরকের পক্ষে) যেসব মনগড়া যুক্তি পেশ করত, সবই সেদিন তাদের থেকে হারিয়ে যাবে।
নিশ্চয় ক্বারূণ ছিল মূসা-এর সম্প্রদায়ভুক্ত। সে তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে। আর আমরা তাকে এমন ধনভান্ডার দিয়েছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল শক্তিশালী লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। যখন তার কওম তাকে বলেছিল, খুশীতে দম্ভ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিকদের ভালবাসেন না।
আর আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তার দ্বারা আখেরাতের গৃহ সন্ধান কর। অবশ্য দুনিয়া থেকে তোমার প্রাপ্য অংশ নিতে ভুলো না। আর অন্যের প্রতি অনুগ্রহ (ছাদাক্বা) কর যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর তুমি পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালবাসেন না।
সে বলল, এই সম্পদ আমি আমার নিজস্ব জ্ঞানের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছি। অথচ সে কি জানেনা যে, আল্লাহ তার পূর্বে বহু যুগ-সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছেন। যারা তার চাইতে শক্তিতে প্রবল ছিল এবং ধন-সম্পদে ছিল অধিক সমৃদ্ধ? বস্ত্তত অপরাধীদেরকে তাদের পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে না।
অতঃপর ক্বারূণ (তাদের উৎসবের দিন) জাঁকজমক সহকারে তার সম্প্রদায়ের সামনে বের হ’ল। তখন যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, হায় ক্বারূণ যা পেয়েছে আমাদেরকে যদি অনুরূপ দেওয়া হ’ত? সত্যিই সে মহা ভাগ্যবান।
আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, ধিক তোমাদের! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য আল্লাহ্র দেওয়া পুরস্কারই উত্তম। এটা কেবল তারাই পাবে, যারা (আল্লাহ্র পরীক্ষায়) ধৈর্যধারণকারী।
অতঃপর আমরা ক্বারূণ ও তার প্রাসাদকে ভূগর্ভে ধ্বসিয়ে দিলাম। তখন তার পক্ষে কোন দলই ছিল না, যারা আল্লাহ্র শাস্তি থেকে বাঁচাতে তাকে সাহায্য করে এবং না সে নিজেও নিজেকে বাঁচাতে পারল।
আর আগের দিন পর্যন্ত যারা তার মত (সম্পদশালী) হওয়ার আকাংখী ছিল তারা বলতে লাগল, তোমরা কি দেখনা যে, আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রূযী প্রশস্ত করেন ও সংকুচিত করেন! যদি আল্লাহ আমাদের উপর অনুগ্রহ না করতেন, তাহ’লে আমরাও (আজ) ধ্বসে যেতাম। (আল্লাহ বলেন,) তোমরা কি দেখনা যে, অবিশ্বাসীরা সফলকাম হয় না।
আখেরাতের এই গৃহ আমরা প্রস্ত্তত করে রেখেছি ঐসব মুমিনের জন্য, যারা দুনিয়াতে ঔদ্ধত্য ও অশান্তি কামনা করে না। বস্ত্তত শুভ পরিণাম কেবল আল্লাহভীরুদের জন্য।
যে ব্যক্তি (ক্বিয়ামতের দিন) সৎকর্ম নিয়ে আগমন করবে, তার জন্য তদপেক্ষা উত্তম প্রতিদান থাকবে। আর যে ব্যক্তি মন্দকর্ম নিয়ে আগমন করবে, সে তার কৃতকর্ম অনুযায়ী মন্দফল ব্যতীত প্রাপ্ত হবেনা।
নিশ্চয়ই যিনি তোমার উপর কুরআনকে (অর্থাৎ এর তেলাওয়াতকে) ফরয করেছেন, তিনি অবশ্যই তোমাকে পূর্বের স্থানে (মক্কায়) ফিরিয়ে আনবেন। তুমি বল, আমার পালনকর্তা ভালভাবেই জানেন, কে হেদায়াত নিয়ে এসেছে এবং কে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে।
আর তুমি তো কখনো আশা করোনি যে, তোমার উপর কিতাব অবতীর্ণ হবে। এটা তো তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ মাত্র। অতএব তুমি অবশ্যই অবিশ্বাসীদের সাহায্যকারী হয়ো না।
আর তোমার প্রতি আল্লাহ্র আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার পর তারা যেন তোমাকে সেগুলি থেকে ফিরিয়ে না নেয়। আর তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকে আহবান কর এবং অবশ্যই তুমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।
আর তুমি আল্লাহ্র সাথে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করো না। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। প্রত্যেক বস্ত্তই ধ্বংস হবে তাঁর চেহারা ব্যতীত। বিধান কেবল তাঁরই এবং তাঁর নিকটেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।