بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো। এরপরেও অবিশ্বাসীরা তাদের প্রতিপালকের সাথে অন্যকে সমতুল্য গণ্য করে।
তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। অতঃপর তোমাদের আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করেছেন। আরও একটি চূড়ান্ত মেয়াদ (ক্বিয়ামত) তাঁর ইলমে রয়েছে। এরপরেও তোমরা সন্দেহ করে থাক।
আর তিনিই আল্লাহ, নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে। তিনি জানেন তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য বিষয় সমূহ এবং জানেন যা কিছু তোমরা উপার্জন করে থাক।
অথচ তাদের নিকট তাদের প্রতিপালকের নিদর্শন সমূহ থেকে এমন কোন নিদর্শন আসেনি যা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়নি।
ফলে তাদের নিকট যখন সত্য (কুরআন) এসে গেল, তখন তারা তাতে মিথ্যারোপ করল। অতএব সত্বর তাদের নিকট ঐসব উপহাসের পরিণতির সংবাদসমূহ এসে পৌঁছবে।
তারা কি জানে না তাদের পূর্বে কত সম্প্রদায়কে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। যাদেরকে আমরা পৃথিবীতে এমন প্রতিষ্ঠা দান করেছিলাম, যা তোমাদেরকে দেইনি। আমরা আকাশ থেকে তাদের উপর প্রচুর বারি বর্ষণ করেছি এবং তাদের তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত করেছি। কিন্তু তাদের পাপের কারণে আমরা তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছি এবং তাদের পরে অন্য এক যুগ-সম্প্রদায়কে সৃষ্টি করেছি।
যদি আমরা তোমার প্রতি কাগজে লিখিত কোন কিতাব নাযিল করতাম, অতঃপর তারা তা নিজেদের হাত দিয়ে স্পর্শও করত, তথাপি অবিশ্বাসীরা বলত, এটা প্রকাশ্য জাদু ছাড়া কিছু নয়।
তারা আরও বলে, কেন তার উপর একজন ফেরেশতা নাযিল করা হ’ল না (যে তাকে সত্যায়ন করত)। বস্ত্তত যদি আমরা ফেরেশতা নাযিল করতাম, তাহ’লে গোটা ব্যাপারটাই শেষ হয়ে যেত। অতঃপর তাদের কোন অবকাশ দেওয়া হ’ত না।
যদি আমরা তাকে ফেরেশতা করতাম, তাহ’লে তাকে মানুষ রূপেই সৃষ্টি করতাম। আর তাদেরকে আমরা সেই বিভ্রান্তিতেই ফেলে দিতাম, যার মধ্যে তারা এখন পড়ে আছে।
আর নিশ্চয়ই তোমার পূর্বের রাসূলগণকে উপহাস করা হয়েছিল। অতঃপর তাদের সাথে যারা উপহাস করেছিল, তাদেরকে তার মন্দফল (শাস্তি) বেষ্টন করে নিয়েছিল।
বলে দাও! তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর। অতঃপর দেখ মিথ্যারোপকারীদের পরিণতি কেমন হয়েছে।
তুমি বল, নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে, তার মালিকানা কার? বলে দাও, আল্লাহ্র। তিনি দয়াকে নিজের উপর বিধিবদ্ধ করে নিয়েছেন। অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে ক্বিয়ামতের দিন একত্রিত করবেন, যাতে কোন সন্দেহ নেই। (তবে) যারা নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তারা তো বিশ্বাস স্থাপন করবে না।
রাত্রি ও দিবসে যা কিছু স্থিতি লাভ করে, সবকিছুই আল্লাহ্র। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
তুমি বল! আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করব? যিনি আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা এবং যিনি খাওয়ান ও তাঁকে কেউ খাওয়ায় না। বলে দাও! আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, (আমার উম্মতের মধ্যে) আমিই প্রথম আজ্ঞাবহ হব এবং (আদিষ্ট হয়েছি যে,) তুমি অবশ্যই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
তুমি বল, আমি মহা দিবসের শাস্তিকে ভয় করি, যদি আমি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই।
সেদিন যার উপর থেকে শাস্তি ফিরিয়ে নেওয়া হবে, তার প্রতি আল্লাহ বড় অনুগ্রহ করবেন। আর সেটাই হবে স্পষ্ট সফলতা।
আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোন কষ্ট দেন, তবে তিনি ব্যতীত তা দূর করার কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমার কোন মঙ্গল করেন, তবে তিনি সকল কিছুর উপরে সর্বশক্তিমান।
তিনি স্বীয় বান্দাদের উপর পরাক্রমশালী। তিনি প্রজ্ঞাময় ও সকল বিষয়ে অবগত।
বল, সাক্ষ্য হিসাবে কোনটা সবচেয়ে বড়? তুমি বল, আল্লাহ (অর্থাৎ তাঁর একত্বের সাক্ষ্য)। আমার ও তোমাদের মধ্যে তিনিই সাক্ষী। আর আমার নিকট অহি করা হয়েছে এই কুরআন, যাতে এর দ্বারা আমি সতর্ক করি তোমাদের ও যাদের নিকট এটি পৌঁছবে। আর তোমরা কি নিশ্চিত সাক্ষ্য দিতে পার যে, আল্লাহ্র সাথে অন্য উপাস্যরা রয়েছে? তুমি বল, আমি এরূপ সাক্ষ্য দিব না। বল, তিনিই একমাত্র উপাস্য। আর তোমরা যেসব বিষয়ে শিরক কর সেসব হ’তে আমি মুক্ত।
যাদেরকে আমরা কিতাব প্রদান করেছি, তারা তাকে (মুহাম্মাদকে) চেনে, যেভাবে তারা তাদের সন্তানদের চেনে। কিন্তু যারা নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তারা তো বিশ্বাস স্থাপন করবে না।
যে ব্যক্তি আল্লাহ্র উপর মিথ্যা অপবাদ দেয় কিংবা তাঁর আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করে, তার চেয়ে বড় যালেম আর কে আছে? নিশ্চয়ই যালেমরা কখনো সফলকাম হয় না।
আর (স্মরণ কর), যেদিন আমরা তাদের সবাইকে একত্রিত করব, অতঃপর যারা শিরক করত তাদের বলব, যাদেরকে তোমরা আমার শরীক ধারণা করতে তারা কোথায়?
অতঃপর তাদের এই পরীক্ষায় কিছুই বলার থাকবে না কেবল এতটুকু ছাড়া যে, তারা বলবে, আল্লাহ্র কসম হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা মুশরিক ছিলাম না।
দেখ তারা কিভাবে নিজেদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলছে। আর এভাবেই তাদের থেকে উধাও হয়ে যাবে তাদের উপাস্যরা, যাদের নামে তারা মিথ্যা রটনা করে।
আর তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা তোমার কথা কান লাগিয়ে শোনে (কিন্তু গ্রহণ করে না)। আমরা তাদের অন্তর সমূহে আবরণ টেনে দিয়েছি ফলে তারা এটা (কুরআন) বুঝতে পারে না এবং তাদের কানে বধিরতা আরোপ করেছি। বস্ত্তত তারা যদি সমস্ত নিদর্শনও অবলোকন করে, তথাপি তারা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করবে না। এমনকি যখন তারা তোমার কাছে ঝগড়া করতে আসে, তখন অবিশ্বাসীরা বলে, এসব তো পুরাকালের কাহিনী ব্যতীত কিছু নয়।
আর তারা মানুষকে (সত্য গ্রহণে) নিষেধ করে এবং নিজেরা তা থেকে দূরে থাকে। এর ফলে তারা কেবল নিজেদেরকেই ধ্বংস করছে। অথচ তারা বুঝতে পারছে না।
যদি তুমি তাদের সেই সময়ের অবস্থা দেখতে, যখন তাদেরকে জাহান্নামের কিনারে দাঁড় করানো হবে। অতঃপর তারা বলবে, হায় যদি আমাদের পুনরায় (দুনিয়ায়) ফিরিয়ে দেওয়া হ’ত, তাহ’লে আমরা আমাদের প্রতিপালকের আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করতাম না এবং আমরা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম।
বরং তাদের নিকট প্রকাশিত হয়ে পড়বে যা তারা ইতিপূর্বে গোপন করত (অর্থাৎ শিরক)। বস্ত্তত যদি তাদের পুনরায় দুনিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়, তাহ’লে তারা পুনরায় নিষিদ্ধ বিষয়ের দিকে ফিরে যাবে। আর নিশ্চিতভাবে তারা মিথ্যাবাদী।
তারা বলে, আমাদের এই পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন। আমরা আর পুনরুত্থিত হবো না।
যদি তুমি দেখতে যখন তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে দাঁড় করানো হবে; আর তিনি তাদেরকে বলবেন, এটা (ক্বিয়ামত) কি সত্য নয়? তারা বলবে, হ্যাঁ, আমাদের প্রতিপালকের কসম! তিনি বলবেন, অতএব এখন তোমরা তোমাদের অবিশ্বাসের শাস্তি ভোগ কর।
নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাতের বিষয়ে মিথ্যারোপ করেছে। এভাবে যখন হঠাৎ ক্বিয়ামত এসে যাবে, তখন তারা বলবে, হায় এ বিষয়ে আমরা কতই না বাড়াবাড়ি করেছি। ফলে তারা নিজেদের পাপের বোঝা নিজেদের পিঠে বহন করবে। সাবধান! কতইনা নিকৃষ্ট ঐ বোঝাগুলি যা তারা বহন করে।
পার্থিব জীবন খেল-তামাশা বৈ কিছুই নয়। আর নিঃসন্দেহে আল্লাহভীরুদের জন্য পরকালীন জীবনই উত্তম। এরপরেও কি তোমরা বুঝবে না?
আমরা জানি, যেসব কথা তারা বলে তা তোমাকে দুঃখ দেয়। কিন্তু ওরা তো তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে না, বরং যালেমরা আল্লাহ্র আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।
তোমার পূর্বের বহু রাসূলকে মিথ্যা বলা হয়েছে। কিন্তু তারা এ মিথ্যারোপে ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং নির্যাতিত হয়েছেন যতক্ষণ না তাদের কাছে আমাদের সাহায্য এসে পৌঁছেছে। বস্ত্তত আল্লাহ্র বাণীসমূহের পরিবর্তনকারী কেউ নেই। আর নবীগণের কিছু খবর (ইতিমধ্যে) তোমার নিকট পৌঁছে গেছে।
আর যদি তাদের উপেক্ষা তোমার নিকট অসহনীয় হয়ে পড়ে, তাহ’লে ক্ষমতা থাকলে মাটিতে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বা আকাশে সিঁড়ি লাগিয়ে দেখ কোন নিদর্শন আনতে পারো কি? (মনে রেখ) যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহ’লে তাদের সবাইকে হেদায়াতের উপর একত্রিত করতেন। অতএব তুমি জাহিলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।
কেবল তারাই (সত্য) কবুল করে যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে। আর মৃতদের আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন উঠাবেন। অতঃপর তারা সবাই তাঁর নিকটে প্রত্যাবর্তিত হবে।
আর তারা বলে, তার প্রতি তার পালনকর্তার পক্ষ হ’তে কোন নিদর্শন কেন নাযিল হ’ল না? তুমি বল, যেকোন নিদর্শন নাযিল করতে আল্লাহ পূর্ণ ক্ষমতাশালী। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।
পৃথিবীতে বিচরণশীল প্রাণীকুল এবং দু’ডানায় ভর করে আকাশে সন্তরণশীল পক্ষীকুল তোমাদের মতই একেকটি সৃষ্টি। এই কিতাবে কোন কিছুই আমরা বলতে ছাড়িনি। অতঃপর তাদের সকলকে তাদের প্রতিপালকের নিকটে একত্রিত করা হবে।
আর যারা আমাদের আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করে, তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত মূক ও বধির। বস্ত্তত আল্লাহ যাকে চান তাকে পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান তাকে সরল পথের উপর দৃঢ় রাখেন।
বল, তোমরা ভেবে দেখ যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ্র কোন শাস্তি এসে যায় অথবা ক্বিয়ামত এসে পড়ে, তাহ’লে তোমরা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে ডাকবে? যদি তোমরা সত্যবাদী হও?
বরং তখন তো তোমরা কেবল তাঁকেই ডাকবে। অতঃপর তোমরা যে বিপদের জন্য তাঁকে ডেকেছিলে তিনি ইচ্ছা করলে তা দূরও করে দেন। আর তখন তোমরা তোমাদের শরীকদের ভুলে যাও।
আর আমরা তোমার পূর্বে বহু জাতির নিকট রাসূল পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর (তাদের অবিশ্বাসের কারণে) আমরা তাদেরকে অভাব-অনটন ও রোগ-ব্যাধি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। যাতে তারা (আল্লাহ্র নিকট) কাকুতি-মিনতি করে।
কিন্তু যখন তাদের কাছে আমাদের শাস্তি এসে গেল, তখন কেন তারা বিনীত হ’ল না? বরং তাদের অন্তরগুলি শক্ত হয়ে গেল এবং শয়তান তাদের কাজগুলিকে তাদের নিকটে শোভনীয় করে দেখালো।
অতঃপর যখন তারা ঐসব উপদেশ ভুলে গেল যা তাদের দেওয়া হয়েছিল, তখন আমরা তাদের জন্য প্রত্যেক বস্ত্তর (প্রবৃদ্ধির) দুয়ার সমূহ খুলে দিলাম। এভাবে তারা যখন নে‘মত সমূহ পেয়ে খুশীতে মত্ত হয়ে গেল, তখন তাদেরকে আমরা হঠাৎ পাকড়াও করলাম। ফলে তারা হতাশ হয়ে পড়ল।
অতঃপর অত্যাচারী সম্প্রদায়ের মূল শিকড় কেটে ফেলা হ’ল। অতএব সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য, যিনি বিশ্বচরাচরের পালনকর্তা।
বল, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, যদি আল্লাহ তোমাদের কান ও চোখ নিয়ে নেন এবং তোমাদের অন্তর সমূহে মোহর মেরে দেন, তাহ’লে আল্লাহ ব্যতীত কোন্ উপাস্য আছে যে ওগুলি তোমাদের এনে দিবে? দেখ কিভাবে আমরা তাদেরকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে দিচ্ছি; এরপরেও তারা এড়িয়ে যাচ্ছে।
বল, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, যদি আল্লাহ্র শাস্তি হঠাৎ অথবা প্রকাশ্যভাবে তোমাদের উপর এসে পড়ে, তাহ’লে অত্যাচারী সম্প্রদায় ব্যতীত কেউ ধ্বংস হবে কি?
আমরা নবীগণকে স্রেফ এজন্যই প্রেরণ করি যে, তারা (জান্নাতের) সুসংবাদ দিবে ও (জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শন করবে। অতঃপর যারা ঈমান আনে ও নিজেদেরকে সংশোধন করে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তান্বিত হবে না।
আর যারা আমাদের আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করে, তাদেরকে তাদের পাপাচারের কারণে আযাব স্পর্শ করে।
বলে দাও, আমি তোমাদের একথা বলিনা যে, আমার কাছে আল্লাহ্র ধনভান্ডার রয়েছে। আর আমি অদৃশ্যের খবর রাখি না এবং একথাও বলিনা যে, আমি ফেরেশতা। আমি তো কেবল অনুসরণ করি যা আমার প্রতি অহি করা হয়। তুমি বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান? তোমরা কি চিন্তা করবে না?
আর তুমি কুরআনের মাধ্যমে তাদেরকে সতর্ক কর। যারা এ বিষয়ে ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট এমন অবস্থায় সমবেত করা হবে, যেখানে তিনি ব্যতীত তাদের কোন সাহায্যকারী ও সুফারিশকারী থাকবে না। যাতে তারা সংযত হয়।
আর তুমি তাদেরকে দূরে সরিয়ে দিয়ো না, যারা তাদের প্রতিপালককে ডাকে তাঁর চেহারা অন্বেষণে সকালে ও সন্ধ্যায়। তাদের হিসাবের কোন দায়িত্ব তোমার উপরে নেই এবং তোমার হিসাবের কোন দায়িত্ব তাদের উপরে নেই যে, তুমি তাদেরকে বিতাড়িত করবে। তাহ’লে তুমি যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
আর এভাবেই আমরা তাদের পরস্পরকে পরীক্ষায় ফেলি। যাতে তারা বলে যে, আমাদের মধ্য থেকে আল্লাহ কি কেবল এই লোকগুলির উপরেই অনুগ্রহ করেছেন? অথচ আল্লাহ কি তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদের সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত নন?
আর আমার আয়াত সমূহে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ যখন তোমার নিকটে আসে, তখন তুমি বল, তোমাদের উপর ‘সালাম’। তোমাদের প্রতিপালক দয়াশীলতাকে তার নিজের উপর বিধিবদ্ধ করে নিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অজ্ঞতাবশে কোন মন্দকাজ করে, অতঃপর যদি সে তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তাহ’লে তিনি (তার ব্যাপারে) ক্ষমাশীল ও দয়াবান।
এমনিভাবে আমরা আয়াতসমূহ সবিস্তারে বর্ণনা করি। আর যাতে পাপাচারীদের পথ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তুমি বল, আমাকে নিষেধ করা হয়েছে যে, আমি আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের ইবাদত করব, যাদের তোমরা আহবান করে থাক। বলে দাও, আমি তোমাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করব না। তাতে আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাব এবং সুপথ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত থাকবো না।
তুমি বল, আমি আমার প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে স্পষ্ট দলীলের (কুরআন) উপর প্রতিষ্ঠিত আছি। অথচ তোমরা তাতে মিথ্যারোপ করে থাক। আর তোমরা দ্রুত যে বিষয়টি (অর্থাৎ গযব) কামনা করছ, তা নাযিল করার ক্ষমতা আমার নেই। হুকুমের মালিক কেউ নয় আল্লাহ ব্যতীত। তিনি সত্য বিবৃত করেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়ছালাকারী।
তুমি বল, যে বস্ত্তটি (অর্থাৎ গযব) তোমরা দ্রুত পেতে চাচ্ছ, তা যদি আমার এখতিয়ারে থাকত, তাহ’লে তো আমার ও তোমাদের মধ্যে (অনেক আগেই) ফায়ছালা হয়ে যেত। বস্ত্তত আল্লাহ যালেমদের সম্পর্কে ভালভাবেই জানেন।
আর গায়েবের চাবিকাঠি তাঁর কাছেই রয়েছে। তিনি ব্যতীত কেউই তা জানেনা। স্থলে ও জলে যা কিছু আছে, সবই তিনি জানেন। গাছের একটি পাতা ঝরলেও সেটা তিনি জানেন। মাটির নীচে অন্ধকারে লুক্কায়িত এমন কোন শস্যবীজ নেই বা সেখানে পতিত এমন কোন সরস বা নীরস বস্ত্ত নেই, যা (আল্লাহ্র) সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই।
তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে রাত্রিতে (ঘুমের মাধ্যমে) মৃত্যু দান করেন এবং তিনি জানেন দিনের বেলা তোমরা যে পরিশ্রম করে থাক। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে ঘুম থেকে জাগ্রত করেন, যাতে তোমাদের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পূর্ণ হয়। অতঃপর তাঁর কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দিবেন।
তিনি স্বীয় বান্দাদের উপর পরাক্রমশালী। তিনি তোমাদের উপর হেফাযতকারীদের (ফেরেশতাদের) পাঠিয়ে থাকেন। পরিশেষে যখন তোমাদের কারো মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হয়, তখন আমাদের দূতগণ (ফেরেশতাগণ) তার আত্মা হরণ করে নেয় এবং এতে তারা আদৌ ত্রুটি করে না।
অতঃপর সকলে তাদের প্রকৃত অভিভাবক আল্লাহ্র নিকটে প্রত্যাবর্তিত হবে। মনে রেখ, হুকুম কেবল তাঁরই এবং তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
বল, কে তোমাদেরকে স্থলের ও সমুদ্রের অন্ধকার থেকে মুক্তি দেন? যখন তোমরা তাঁকে ডাক কাতরভাবে ও চুপে চুপে, আর বল, যদি তিনি আমাদেরকে এই (বিপদ) থেকে উদ্ধার করেন, তাহ’লে অবশ্যই আমরা কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হব।
বলে দাও, আল্লাহ তোমাদেরকে ঐ বিপদ থেকে এবং অন্যান্য সকল বিপদ থেকে রক্ষা করে থাকেন। তথাপি তোমরা তার সাথে শরীক করে থাক।
বলে দাও, তিনিই তোমাদেরকে উপর থেকে বা নীচ থেকে বা তোমাদেরকে দলে-উপদলে বিভক্ত করে পরস্পরে লড়াইয়ের স্বাদ গ্রহণ করাতে পূর্ণ ক্ষমতাবান। দেখ কত বিশদভাবেই না আমরা আয়াতসমূহ ব্যাখ্যা করি যাতে তারা হৃদয়ঙ্গম করে।
(হে মুহাম্মাদ!) তোমার সম্প্রদায় এতে (কুরআন) মিথ্যারোপ করছে। অথচ এটাই সত্য। তুমি বলে দাও যে, আমি তোমাদের উপর তত্তবাবধায়ক নই।
প্রত্যেক খবরের একটা নির্দিষ্ট সময়কাল রয়েছে। অচিরেই তোমরা তা জানতে পারবে।
যখন তুমি দেখবে যে, লোকেরা আমাদের আয়াত সমূহে ছিদ্রান্বেষণ করছে, তখন তুমি তাদের থেকে সরে যাও, যতক্ষণ না তারা অন্য কথায় লিপ্ত হয়। আর যদি শয়তান তোমাকে এটা ভুলিয়ে দেয়, তাহ’লে স্মরণ হওয়ার পর আর যালেম সমাজের সাথে বসবে না।
মুত্তাক্বীদের উপর ঐসব যালেমদের (পরকালীন) হিসাবের কোন দায়িত্ব নেই। কিন্তু উপদেশ দিবে। যাতে ওরা সংযত হয়।
যারা নিজেদের দ্বীনকে খেল-তামাশার বস্ত্ততে পরিণত করেছে এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে ধোঁকায় ফেলেছে, তাদেরকে তুমি পরিত্যাগ কর। তুমি তাদেরকে কুরআন দ্বারা উপদেশ দাও, যাতে কেউ স্বীয় কৃতকর্মের দরুন ঐদিন ধ্বংস না হয়, যেদিন আল্লাহ ব্যতীত তার কোন বন্ধু বা কোন সুফারিশকারী থাকবে না। আর যেদিন সকল প্রকার বিনিময় দিলেও তা গ্রহণ করা হবে না। এইসব লোকেরা নিজেদের কর্মদোষে ধ্বংস হয়েছে। তাদের অবিশ্বাসের কারণে তাদের প্রতিফল হিসাবে রয়েছে উত্তপ্ত পানীয় এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
তুমি বলে দাও, আমরা কি আল্লাহকে ছেড়ে এমন কিছুকে আহবান করব, যা আমাদের কোন উপকারও করতে পারেনা, ক্ষতিও করতে পারেনা? আর আল্লাহ আমাদের সুপথ প্রদর্শনের পর আমরা কি পুনরায় পিছন দিকে ফিরে যাব? আমরা কি ঐ ব্যক্তির ন্যায় হব যাকে শয়তানরা বিভ্রান্ত করেছে ও সে জনপদে দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে? আর তার সাথীরা তাকে হেদায়াতের দিকে ডেকে বলছে, তুমি আমাদের দিকে এসো। বলে দাও, নিশ্চয় আল্লাহ্র দেখানো পথই প্রকৃত পথ। আর আমরা আদিষ্ট হয়েছি যেন বিশ্বপালকের প্রতি আমরা আত্মসমর্পণ করি।
আর তোমরা ছালাত কায়েম কর ও তাঁকে ভয় কর। বস্ত্তত তাঁর কাছেই তোমাদের একত্রিত করা হবে।
তিনিই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন যথার্থভাবে এবং সেদিন তিনি বলবেন হও, অতঃপর তা হয়ে যাবে (অর্থাৎ ক্বিয়ামত)। তাঁর কথাই সত্য। আর তাঁরই জন্য রাজত্ব, যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে। তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যমান সবকিছুই জানেন। তিনি প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। (৭ পারার তিন চতুর্থাংশ)
আর (স্মরণ কর), যখন ইব্রাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিল, তুমি কি (আল্লাহকে ছেড়ে) মূর্তিগুলিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করছ? আমি তো দেখছি তুমি ও তোমার সম্প্রদায় স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছ।
আর এভাবেই আমরা ইব্রাহীমকে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব প্রদর্শন করি। আর যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
অতঃপর যখন তার উপর রাত্রির অন্ধকার আচ্ছন্ন হ’ল, তখন সে নক্ষত্র দেখে বলল, এটিই আমার রব। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হ’ল, তখন সে বলল, আমি অস্তগামীদের ভালবাসি না।
অতঃপর যখন সে উজ্জ্বল চন্দ্রকে দেখল, তখন বলল, এটিই আমার রব। কিন্তু যখন সেটি অস্তমিত হ’ল, তখন সে বলল, যদি আমার প্রতিপালক আমাকে পথপ্রদর্শন না করেন, তাহ’লে আমি পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
অতঃপর যখন সে কিরণময় সূর্যকে দেখল, তখন বলল এটাই আমার রব ও এটাই সবচেয়ে বড়। কিন্তু পরে যখন তা ডুবে গেল, তখন সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেগুলিকে (আল্লাহ্র সাথে) শরীক করো, আমি সেসব থেকে মুক্ত।
আমি আমার চেহারাকে একনিষ্ঠভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছি ঐ সত্তার দিকে, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।
অতঃপর তার কওম তার সাথে বিতন্ডা করল। সে বলল, তোমরা আমার সাথে আল্লাহ সম্পর্কে বিতন্ডা করছ? অথচ তিনিই আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করেছেন। আর তোমরা যাদেরকে তাঁর সাথে শরীক কর, আমি সেসবের ভয় করি না, তবে যদি আমার প্রতিপালক কিছু (কষ্ট দিতে) চান। আমার প্রতিপালকের জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। এরপরেও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?
তোমরা যাদের শরীক কর, কিভাবে আমি তাদের ভয় করতে পারি? অথচ তোমরা এ ভয় করো না যে, আল্লাহ্র সাথে তোমরা যাদের শরীক করো, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদের উপর কোন প্রমাণ নাযিল করেননি। অতঃপর উভয় দলের মধ্যে (জাহান্নাম থেকে) নিরাপত্তা লাভের কে সর্বাধিক হকদার? যদি তোমরা জ্ঞানী হয়ে থাক।
যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানের সাথে শিরককে মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই সুপথ প্রাপ্ত।
এগুলিই ছিল আমাদের যুক্তি-প্রমাণ, যা আমরা ইব্রাহীমকে তার স্বজাতির মোকাবিলায় প্রদান করেছিলাম। আমরা যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নত করি। নিশ্চয়ই তোমার পালনকর্তা প্রজ্ঞাময় ও সুবিজ্ঞ।
আর আমরা ইব্রাহীমকে দান করেছিলাম ইসহাক ও ইয়াকূবকে। তাদের প্রত্যেককে আমরা সুপথ প্রদর্শন করেছিলাম। ইতিপূর্বে নূহকেও আমরা পথ প্রদর্শন করেছিলাম। একইভাবে করেছিলাম তার সন্তানদের মধ্যে দাঊদ, সুলায়মান, আইয়ূব, ইউসুফ, মূসা ও হারূণকে। আর এভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি।
এছাড়াও যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা ও ইলিয়াসকে। তারা প্রত্যেকে ছিল সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।
এছাড়া ইসমাঈল, আল-ইয়াসা‘, ইউনুস ও লূতকে। আর তাদের প্রত্যেককে আমরা জগদ্বাসীর উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম।
এছাড়াও এদের বাপ-দাদা, সন্তান-সন্ততি ও ভাইদের মধ্য হ’তে অনেককে। আমরা তাদের বাছাই করে নিয়েছিলাম এবং তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম।
এটাই আল্লাহ্র দেখানো পথ। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চান তাকে এ পথে পরিচালিত করেন। তবে যদি তারা শিরক করত, তাহ’লে তাদের সব সৎকর্ম বিফলে যেত।
এরা ছিল সেই সব মানুষ, যাদেরকে আমরা কিতাব, প্রজ্ঞা ও নবুঅত দান করেছিলাম। এক্ষণে যদি অবিশ্বাসীরা এগুলিকে অস্বীকার করে, তাহ’লে আমরা এমন সব জাতিকে নিযুক্ত করব, যারা এগুলিতে অবিশ্বাস করবে না।
এরাই হ’ল ঐসব মানুষ যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করেছিলেন। অতএব তুমি তাদের পথ অনুসরণ কর। বলে দাও যে, এর বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কোন মজুরী চাই না। বস্ত্তত এটি কুরআন, যা বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ ব্যতীত নয়।
আর তারা আল্লাহ্র মর্যাদা যথাযথভাবে উপলব্ধি করেনা, যখন তারা বলে যে, আল্লাহ কোন মানুষের উপর কিছু নাযিল করেননি। বলে দাও, তাহ’লে মূসা যে কিতাব নিয়ে এসেছিলেন, তা কে নাযিল করেছিলেন? যা ছিল মানুষের জন্য আলোকবর্তিকা ও হেদায়াত স্বরূপ। যা তোমরা বিক্ষিপ্ত পৃষ্ঠা সমূহে রেখেছ। যার কিছু অংশ তোমরা প্রকাশ কর ও বহু অংশ গোপন কর। যার মধ্যে তোমাদের এমন অনেক বিষয় শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যা তোমরা বা তোমাদের বাপ-দাদারা জানতো না। বলে দাও যে, (ঐ কিতাব নাযিল করেছিলেন) আল্লাহ। অতঃপর ছাড়ো, ওরা ওদের নিরর্থক আলোচনার খেলায় মগ্ন থাকুক।
আর এই বরকতময় কিতাব আমরা নাযিল করেছি, যা পূর্ববর্তী ইলাহী কিতাব সমূহের সত্যায়নকারী। যাতে তুমি মক্কা ও তার আশপাশের লোকদের সতর্ক করতে পার। বস্ত্তত যারা পরকালে বিশ্বাস করে, তারা এই কিতাবে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তারা তাদের ছালাতের হেফাযত করে।
আর ঐ ব্যক্তির চাইতে বড় যালেম আর কে আছে যে আল্লাহ্র প্রতি মিথ্যারোপ করে অথবা বলে যে, আমার প্রতি অহি করা হয়েছে। অথচ তার প্রতি কিছুই অহি করা হয়নি। আর যে ব্যক্তি বলে যে, আমিও অনুরূপ আয়াত বলতে পারি, যেরূপ আল্লাহ নাযিল করেছেন। যদি তুমি দেখতে যখন কাফেররা মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করে, আর ফেরেশতারা হাত বাড়িয়ে বলে, এবার তোমাদের আত্মাগুলিকে বের করে দাও। আজ তোমাদের নিকৃষ্টতম আযাব দেওয়া হবে। কারণ তোমরা আল্লাহ্র বিরুদ্ধে অসত্য কথা বলতে এবং তোমরা তাঁর আয়াতসমূহে অহংকার প্রদর্শন করতে।
তোমরা (ক্বিয়ামতের দিন) আমার কাছে এসেছ একাকী, যেমন তোমাদেরকে আমরা প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম একাকী। আর যা কিছু আমরা তোমাদের দিয়েছিলাম, সবকিছু তোমরা পশ্চাতে ছেড়ে এসেছ। আর আমরা তো তোমাদের সাথে সেইসব সুফারিশকারীদের দেখছি না, যাদের ব্যাপারে তোমরা ধারণা করতে যে, তারা তোমাদের ভাল-মন্দে (আমার) শরীক। বাস্তবিকই তোমাদের পরস্পরের সম্পর্ক (আজ) ছিন্ন হয়ে গেছে। আর তোমরা যাদের উপাস্য ধারণা করতে সবই তোমাদের থেকে উধাও হয়ে গেছে।
নিশ্চয়ই আল্লাহ শস্যবীজ ও ফলের অাঁটি থেকে অংকুরোদ্গমনকারী। তিনি জীবিতকে মৃত হ’তে বের করেন এবং মৃতকে জীবিত হ’তে বের করেন। তিনিই আল্লাহ। অতএব তোমরা কোথায় ঘুরছ?
তিনি প্রভাতরশ্মির উন্মেষকারী। তিনি রাত্রিকে বিশ্রামকাল এবং সূর্য ও চন্দ্রকে সময় নিরূপক হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। এটি হ’ল মহাপরাক্রান্ত ও মহাজ্ঞানী (আল্লাহ্র) নির্ধারণ।
তিনি তোমাদের জন্য নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা এর মাধ্যমে স্থলের ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথের দিশা পাও। নিশ্চয়ই আমরা নিদর্শন সমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য।
তিনি তোমাদেরকে একজন ব্যক্তি (আদম) হ’তে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমাদের জন্য স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা নির্ধারণ করেছেন। নিশ্চয়ই আমরা নিদর্শন সমূহ ব্যাখ্যা করি বুঝদার সম্প্রদায়ের জন্য।
তিনি আকাশ হ’তে বারি বর্ষণ করেন। অতঃপর আমরা তা দিয়ে সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি। অতঃপর তা থেকে সবুজ বৃক্ষ বের করে আনি। যার মধ্য থেকে আমরা ঘন সন্নিবেশিত শস্যদানা নির্গত করি। আর আমরা খেজুরের গুচ্ছ থেকে নোয়ানো কাঁদি বের করে আনি। আর (সৃষ্টি করি) আঙ্গুর, জলপাই ও ডালিমের বাগিচা সমূহ, যা পরস্পরে সাদৃশ্যপূর্ণ ও সাদৃশ্যহীন। তোমরা লক্ষ্য কর এসবের ফলের প্রতি, যখন তা ফলবন্ত হয়। অতঃপর তা পরিপক্ক হয়। এসবের মধ্যে নির্দশন সমূহ রয়েছে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য।
আর তারা জিনদেরকে আল্লাহ্র শরীক বানিয়েছে। অথচ তিনিই এদের সৃষ্টি করেছেন। তাছাড়া তারা আল্লাহ্র জন্য পুত্র ও কন্যা সাব্যস্ত করেছে অজ্ঞতাবশে। অথচ তিনি (এসব থেকে) পবিত্র এবং তারা যেসব কথা বলে, সেসব থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে।
তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবক। কিভাবে তাঁর সন্তান হ’তে পারে? অথচ তাঁর কোন সঙ্গিনী নেই এবং তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি প্রত্যেক বস্ত্ত সম্পর্কে সুবিজ্ঞ।
তিনিই আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা। অতএব তোমরা তারই ইবাদত কর। আর তিনিই সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক।
কোন দৃষ্টি তাঁকে (দুনিয়াতে) বেষ্টন করতে পারে না। বরং তিনিই সকল দৃষ্টিকে বেষ্টন করেন। তিনি অতীব সূক্ষ্মদর্শী ও সকল বিষয়ে অবগত।
নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে সুস্পষ্ট জ্ঞান এসে গেছে। অতঃপর যে ব্যক্তি তা থেকে আলো গ্রহণ করবে, সে নিজেরই কল্যাণ সাধন করবে। আর যে ব্যক্তি চোখ বন্ধ করে রাখবে, সে নিজেরই ক্ষতি সাধন করবে। আর আমি (মুহাম্মাদ) তোমাদের উপর পাহারাদার নই।
(আল্লাহ বলেন,) আর এভাবে আমরা আয়াতসমূহ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করি, যাতে তারা বলে যে, তুমি আয়াতগুলি বারবার পাঠ করেছ। আর এজন্য যাতে আমরা এটি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য ভালভাবে ব্যাখ্যা করে দিতে পারি।
তোমার প্রতি তোমার প্রভুর পক্ষ হ’তে যে ‘অহি’ নাযিল করা হয় তুমি তারই অনুসরণ কর। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আর তুমি মুশরিকদের এড়িয়ে চল।
যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তারা শিরক করত না। আর আমরা তোমাকে তাদের উপর পাহারাদার নিযুক্ত করিনি। আর তুমি তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক নও।
(হে বিশ্বাসীগণ!) তোমরা তাদের গালি দিয়োনা যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে আহবান করে। তাহ’লে ওরা অজ্ঞতাবশে বাড়াবাড়ি করে আল্লাহকে গালি দিবে। এভাবে আমরা (মুমিন-কাফের) প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট তাদের স্ব স্ব কর্মকে সুশোভিত করে দিয়েছি (পরীক্ষা স্বরূপ)। অবশেষে তাদেরকে তাদের প্রভুর নিকটেই ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন।
আর তারা দৃঢ় অঙ্গীকারসহ আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলে যে, যদি তাদের নিকট কোন একটি (অলৌকিক) নিদর্শন এসে যায়, তাহ’লে তারা অবশ্যই ঈমান আনবে। বলে দাও, নিদর্শনসমূহ তো কেবল আল্লাহ্র এখতিয়ারে। আর (হে মুসলমানগণ) কিভাবে তোমাদের বুঝানো যাবে যে, নিদর্শন আসলেও ওরা ঈমান আনবে না।
আর তারা যেমন প্রথমবার এতে ঈমান আনেনি, আমরাও তেমন তাদের অন্তর ও দৃষ্টিসমূহকে ঘুরিয়ে দেব। আর আমরা তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যে বিভ্রান্ত অবস্থায় ছেড়ে দেব।
আর যদি আমরা তাদের নিকট ফেরেশতা নাযিল করতাম ও মৃতরা তাদের সাথে কথা বলত এবং সকল বস্ত্ত তাদের চোখের সামনে জীবিত করে হাযির করে দিতাম, তবুও তারা ঈমান আনতো না আল্লাহ্র ইচ্ছা ব্যতীত। কিন্তু তাদের অধিকাংশই মূর্খ।
আর এভাবে আমরা প্রত্যেক নবীর জন্য মানুষ ও জিনের বহু শয়তানকে শত্রুরূপে নিযুক্ত করেছি। তারা একে অপরকে চাকচিক্যপূর্ণ কথা দ্বারা প্ররোচনা দেয় প্রতারণার জন্য। যদি তোমার প্রতিপালক চাইতেন, তাহ’লে তারা এটা করতে পারতো না। অতএব তুমি ছাড় ওদেরকে ও ওদের মিথ্যা রটনাসমূহকে।
আর তারা এটা এজন্য করে, যাতে পরকালে অবিশ্বাসীদের অন্তরসমূহ ঐ কথার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং যাতে তারা ঐ অবিশ্বাসীকে সন্তুষ্ট করতে পারে। আর যাতে তারা ঐসব (মন্দ) উপার্জন চালিয়ে যেতে পারে যা তারা করে থাকে।
(তুমি বল) তবে কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে বিচারকরূপে কামনা করব? অথচ তিনি তোমাদের প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ। আর যাদেরকে আমরা ইতিপূর্বে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা ভালভাবেই জানে যে, এটি (কুরআন) তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে সত্যসহ নাযিল হয়েছে। অতএব তুমি অবশ্যই সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।
তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায় দ্বারা পূর্ণ। তাঁর বাণীর পরিবর্তনকারী কেউ নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
অতএব যদি তুমি জনপদের অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চল, তাহ’লে ওরা তোমাকে আল্লাহ্র পথ থেকে বিচ্যুৎ করবে। তারা তো কেবল ধারণার অনুসরণ করে এবং তারা তো কেবল অনুমান ভিত্তিক কথা বলে।
নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক সর্বাধিক জ্ঞাত কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুৎ হয়েছে এবং তিনিই সর্বাধিক জ্ঞাত সুপথ প্রাপ্তদের বিষয়ে।
অতএব যে (হালাল) পশুকে আল্লাহ্র নাম নিয়ে যবহ করা হয়েছে, তোমরা তা ভক্ষণ কর, যদি তোমরা তাঁর আয়াত সমূহে বিশ্বাসী হয়ে থাক।
আর তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা ঐ পশু ভক্ষণ করবে না যা আল্লাহ্র নামে যবহ করা হয়েছে? অথচ আল্লাহ তোমাদের উপর যেসব পশু হারাম করেছেন, তা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। তবে তোমরা বাধ্যগত অবস্থায় পড়লে (সে কথা স্বতন্ত্র)। নিশ্চয়ই বহু লোক অজ্ঞতাবশে নিজেদের প্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত হয়ে লোকদের পথভ্রষ্ট করে। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক সীমালংঘনকারীদের বিষয়ে সর্বাধিক অবগত।
আর তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সকল পাপ বর্জন কর। নিশ্চয়ই যারা পাপ অর্জন করে, অচিরেই তারা তাদের কৃতকর্মের মন্দ ফল প্রাপ্ত হবে।
যবহের সময় যেসব (হালাল) পশুর উপর আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তোমরা তা ভক্ষণ করো না। নিশ্চয়ই এটি বড় পাপ। আর শয়তানেরা তাদের বন্ধুদের প্ররোচনা দেয় যেন তারা তোমাদের সাথে বিতন্ডা করে। তবে যদি তোমরা তাদের (শিরকী যুক্তির) আনুগত্য কর, তাহ’লে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হয়ে যাবে।
আর যে ব্যক্তি মৃত ছিল, অতঃপর আমরা তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে আলো দিয়েছি যা দিয়ে সে লোকদের মধ্যে চলাফেরা করে, সে কি ঐ ব্যক্তির মত হ’তে পারে, যে অন্ধকারে ডুবে আছে ও সেখান থেকে বের হবার পথ খুঁজে পায় না। এভাবেই অবিশ্বাসীদের জন্য তাদের কৃতকর্মগুলি সুশোভিত করে দেওয়া হয়।
আর এভাবেই আমরা প্রত্যেক জনপদের শীর্ষ পাপীদের অনুমতি দেই যাতে তারা সেখানে চক্রান্ত করে। অথচ এর দ্বারা তারা কেবল নিজেদেরকেই প্রতারিত করে। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না।
যখন তাদের কাছে কোন আয়াত পৌঁছে, তখন তারা বলে আমরা এতে বিশ্বাস স্থাপন করব না, যতক্ষণ না আমাদেরকে দেওয়া হয় যা আল্লাহ্র (বিগত) রাসূলগণকে দেওয়া হয়েছিল। অথচ আল্লাহ ভালভাবেই জানেন তার রিসালাত কোথায় অর্পণ করতে হবে। পাপীরা সত্বর তাদের প্রতারণার কারণে আল্লাহ্র পক্ষ হ’তে লাঞ্ছনা ও কঠিন শাস্তি প্রাপ্ত হবে।
অতএব আল্লাহ যাকে সুপথ প্রদর্শন করতে চান, তিনি তার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করতে চান, তার বক্ষকে তিনি সংকীর্ণ ও সংকুচিত করে দেন, যেন সে অতি কষ্টে আকাশে আরোহণ করছে। এভাবেই আল্লাহ অবিশ্বাসীদের উপর অপবিত্রতাকে চাপিয়ে দেন।
আর এটাই তোমার প্রতিপালকের সরল পথ। নিশ্চয়ই আমরা উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি।
তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে শান্তির গৃহ। আর তাদের সৎকর্ম সমূহের কারণে তিনিই হ’লেন তাদের অভিভাবক।
আর (স্মরণ কর) যেদিন তিনি তাদের সবাইকে একত্রিত করবেন, তখন তিনি বলবেন, হে জিন সম্প্রদায়! তোমরা বহু মানুষকে তোমাদের অনুগামী করেছিলে। তখন তাদের মানুষ বন্ধুরা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা একে অপরের দ্বারা উপকৃত হ’তে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমরা আমাদের চূড়ান্ত সময়সীমায় পৌঁছে গিয়েছি, যা আপনি আমাদের জন্য নির্ধারিত করেছেন (আল্লাহ বলবেন) জাহান্নামই তোমাদের ঠিকানা। তোমরা এখানে চিরকাল থাকবে। তবে আল্লাহ যাদেরকে চাইবেন (তারাই মুক্তি পাবে)। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময় ও সুবিজ্ঞ।
এভাবে আমরা যালেমদেরকে তাদের কৃতকর্মের দরুণ পরস্পরের বন্ধু বানিয়ে দেব।
হে জিন ও ইনসান জাতি! তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে রাসূলগণ আসেননি, যারা তোমাদের নিকট আমাদের আয়াতসমূহ বর্ণনা করতেন এবং তোমাদেরকে আজকের দিনে সাক্ষাতের বিষয়ে সতর্ক করতেন? তারা বলবে, আমরা আমাদের অপরাধ স্বীকার করছি। বস্ত্তত পার্থিব জীবন তাদের প্রতারিত করেছিল। তারা সেদিন স্বীকার করে নিবে যে, তারা (নবীদের দাওয়াত) প্রত্যাখ্যানকারী ছিল।
আর রাসূল প্রেরণ ছিল এজন্য যে, তোমার প্রতিপালক যেন কোন জনপদকে ধ্বংস না করেন তাদের শিরকের কারণে এমন অবস্থায় যে, তার অধিবাসীগণ (তাওহীদ সম্পর্কে) অজ্ঞ ছিল।
প্রত্যেকের জন্য তার কর্ম অনুযায়ী মর্যাদা রয়েছে। আর তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তোমার প্রতিপালক উদাসীন নন।
আর তোমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত ও দয়াশীল। তিনি ইচ্ছা করলে (হে কাফেরকুল) তোমাদের ধ্বংস করে দিবেন ও যাকে ইচ্ছা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। যেমন তিনি তোমাদেরকে অন্য কওমের বংশধর হ’তে সৃষ্টি করেছেন।
তোমাদের নিকট (ক্বিয়ামতের) যে ওয়াদা দেওয়া হয়েছে, তা অবশ্যই আসবে। আর তোমরা আল্লাহকে অক্ষমকারী নও।
বলে দাও, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের স্থানে কাজ করে যাও। আমিও কাজ করে যাচ্ছি। অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কার জন্য রয়েছে আখেরাতের শুভ পরিণাম। নিশ্চয়ই যালেমরা সফলকাম হয় না।
আর আল্লাহ যেসব শস্য ও গবাদিপশু সৃষ্টি করেছেন, সেখান থেকে তারা তাদের ধারণা অনুযায়ী নির্ধারণ করে বলে যে, এটি আল্লাহ্র অংশ এবং এটি আমাদের শরীকদের অংশ। অতঃপর যে অংশ তাদের শরীকদের জন্য নির্ধারণ করে তাতো আল্লাহ্র কাছে পৌঁছে না, আর যে অংশ আল্লাহ্র জন্য নির্ধারণ করে, তা তাদের শরীকদের নিকট পৌঁছে যায়। কতই না মন্দ বণ্টনের ফায়ছালা তারা করে থাকে।
এমনিভাবে অনেক মুশরিকের নিকট তাদের শরীকরা সন্তান হত্যাকে (বাজে যুক্তি দ্বারা) সুশোভিত করে দিয়েছে, যেন তারা তাদের সর্বনাশ করতে পারে এবং তাদের নিকট তাদের দ্বীনকে সন্দেহ যুক্ত করে দিতে পারে। যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহ’লে তারা একাজ করতে পারত না। অতএব তুমি তাদের ও তাদের মনগড়া বিধানগুলি ছেড়ে দাও।
আর তারা তাদের ধারণা মতে বলে যে, এই পশুগুলি ও শস্যক্ষেতগুলি নিষিদ্ধ। তা কেউ খেতে পারবে না, কেবল আমরা যাকে চাইব সে ব্যতীত। তারা আল্লাহ্র উপর মিথ্যারোপ করে কিছু পশুর পিঠে আরোহণ করা নিষিদ্ধ বলে এবং কিছু পশু যবহ করার সময় তারা তার উপর আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করে না। অচিরেই তিনি তাদেরকে এই মিথ্যারোপের শাস্তি দিবেন।
আর তারা একথাও বলে যে, এসব পশুর গর্ভে যা রয়েছে, তা কেবল আমাদের পুরুষদের জন্য। কিন্তু আমাদের নারীদের জন্য এগুলি নিষিদ্ধ। তবে এসবের যদি মৃত বাচ্চা হয়, তবে তাতে আমাদের নারী-পুরুষ সবাই শরীক হবে। তাদের এইসব মনগড়া বক্তব্যের শাস্তি সত্বর তিনি তাদের দিবেন। তিনি প্রজ্ঞাময় ও সুবিজ্ঞ।
নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যারা নির্বুদ্ধিতার দরুন অজ্ঞতাবশে নিজেদের সন্তানদের হত্যা করে এবং আল্লাহ প্রদত্ত জীবিকাকে আল্লাহ্র উপর মিথ্যারোপ করে নিজেদের উপর হারাম করে, তারা নিশ্চিতরূপে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা সুপথপ্রাপ্ত হয়নি।
তিনিই সেই সত্তা যিনি বাগিচাসমূহ সৃষ্টি করেছেন মাচান বিশিষ্ট ও মাচান বিহীন এবং সৃষ্টি করেছেন খর্জুর বৃক্ষ ও শস্যক্ষেত সমূহ, যেগুলির স্বাদ ভিন্ন ভিন্ন। আর সৃষ্টি করেছেন জলপাই ও ডালিম বৃক্ষ, পরস্পরে সাদৃশ্যপূর্ণ ও সাদৃশ্যহীন। তোমরা এগুলির ফল ভক্ষণ কর যখন তা ফলবন্ত হয় এবং এগুলির হক আদায় কর ফসল কাটার দিন। আর তোমরা অপচয় করো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালবাসেন না।
আর তিনি গবাদিপশুর মধ্যে সৃষ্টি করেছেন কতগুলিকে ভারবাহী এবং কতগুলিকে ক্ষুদ্রাকার। আল্লাহ তোমাদের যেসব রিযিক দান করেছেন, তা থেকে তোমরা ভক্ষণ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
তিনি গবাদিপশু গুলিকে আট প্রকারে সৃষ্টি করেছেন। ভেড়ার দু’প্রকার (নর ও মাদী), ছাগল-দুম্বার দু’প্রকার (নর ও মাদী)। জিজ্ঞেস কর, তিনি কি উভয় নরকে হারাম করেছেন, না উভয় মাদীকে? না উভয় মাদীর গর্ভে যা আছে সেটিকে? তোমরা আমাকে প্রমাণসহ বল, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।
আর তিনি সৃষ্টি করেছেন উটের মধ্যে দু’প্রকার (নর ও মাদী) এবং গরুর মধ্যে দু’প্রকার (নর ও মাদী)। জিজ্ঞেস কর তিনি কি উভয় নরকে হারাম করেছেন, না উভয় মাদীকে? না উভয় মাদীর গর্ভে যা আছে সেটিকে? তোমরা কি তখন হাযির ছিলে যখন আল্লাহ তোমাদের উপর এসব পশু হারাম করার বিধান জারি করেন? অতএব ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা বড় যালেম আর কে আছে, যে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য বিনা প্রমাণে আল্লাহ্র উপর মিথ্যারোপ করে? নিশ্চয়ই আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না।
তুমি বলে দাও, আমার নিকট যা অহি করা হয়েছে, তাতে ভক্ষণকারীর জন্য আমি কোন খাদ্য হারাম পাইনি যা সে ভক্ষণ করে, কেবল মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত ও শূকরের মাংস ব্যতীত। কেননা এগুলি নাপাক বস্ত্ত। আর ঐ প্রাণী ব্যতীত, যা শিরকের কারণে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। তবে যে ব্যক্তি ক্ষুধায় কাতর হয়ে বাধ্যগত অবস্থায় (জীবন রক্ষার্থে) তা খায় কোনরূপ আকাংখা ও সীমালংঘন ছাড়াই, (তার ব্যাপারে) তোমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল ও দয়াবান।
আমরা ইহূদীদের উপর সকল প্রকার নখর বিশিষ্ট প্রাণী হারাম করেছিলাম এবং গরু ও ছাগলের চর্বি। তবে যেগুলি তাদের পিঠে ও নাড়ি-ভুঁড়িতে বা হাড়-হাড্ডিতে মিশে থাকে সেগুলি ব্যতীত। তাদের অবাধ্যতার কারণে আমরা তাদের এই শাস্তি দিয়েছিলাম। আর আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।
যদি তারা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে, তবে বলে দাও যে, তোমাদের পালনকর্তা প্রশস্ত দয়ার অধিকারী। (আর মনে রেখ) পাপী সম্প্রদায় হ’তে তার শাস্তি কখনোই প্রত্যাহার করা হয় না।
সত্বর মুশরিকরা বলবে, যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহ’লে না আমরা শিরক করতাম, না আমাদের বাপ-দাদারা করত এবং না আমরা কোন বস্ত্তকে হারাম করতাম। এভাবেই তাদের পূর্বসুরীরা মিথ্যারোপ করত যতক্ষণ না তারা আমাদের শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করেছে। বল, তোমাদের নিকট কি কোন প্রমাণ আছে, যা আমাদের দেখাতে পারো? বস্ত্তত তোমরা কেবল ধারণার অনুসরণ কর এবং তোমরা কেবল অনুমান ভিত্তিক কথা বল।
বলে দাও, আল্লাহ্রই জন্য চূড়ান্ত প্রমাণ। অতএব তিনি চাইলে অবশ্যই তোমাদের সবাইকে হেদায়াত দান করতেন।
বল, তোমাদের সাক্ষীদের নিয়ে এস। যারা সাক্ষ্য দিবে যে আল্লাহ এগুলি হারাম করেছেন। (ধরে নাও) যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তাহ’লে তুমি তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। আর তুমি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা আমাদের আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে ও যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না এবং যারা তাদের প্রতিপালকের সাথে অন্যকে সমান গণ্য করে।
তুমি বল, এস আমি তোমাদেরকে ঐ বিষয়গুলি পাঠ করে শুনাই যা তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের উপর হারাম করেছেন। আর তা হ’ল এই যে, তোমরা তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। দরিদ্রতার ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না। আমরাই তোমাদের ও তাদের জীবিকা প্রদান করে থাকি। প্রকাশ্য বা গোপন কোন অশ্লীলতার নিকটবর্তী হবে না। ন্যায্য কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন। এসব বিষয় তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা অনুধাবন করো।
তোমরা ইয়াতীমদের মাল-সম্পদের নিকটবর্তী হয়োনা উত্তম পন্থায় ব্যতীত, যতদিন না ঐ ইয়াতীম তার যোগ্য বয়সে উপনীত হয়। আর তোমরা মাপ ও ওযন পূর্ণ কর ইনছাফ সহকারে। বস্ত্তত আমরা কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেই না। আর যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায্য কথা বলবে, তা নিকট জনের বিরুদ্ধে হ’লেও। আর তোমরা আল্লাহ্র সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ কর। এসব বিষয় তিনি তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।
আর এটিই আমার সরল পথ। অতএব তোমরা এ পথেরই অনুসরণ কর। অন্যান্য পথের অনুসরণ করো না। তাহ’লে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুৎ করে দিবে। এসব বিষয় তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা সতর্ক হও।
অতঃপর (ইতিপূর্বে) আমরা মূসাকে দিয়েছিলাম কিতাব (তাওরাত), যা ছিল সৎকর্মশীলদের জন্য পূর্ণাঙ্গ এবং সকল বিষয়ের বিশদ ব্যাখ্যা, পথনির্দেশ ও অনুগ্রহ স্বরূপ। যাতে তারা তাদের প্রভুর সাথে সাক্ষাতে বিশ্বাসী হয়।
বস্ত্তত এই কিতাব (কুরআন) আমরা নাযিল করেছি যা বরকতমন্ডিত। সুতরাং তোমরা এটির অনুসরণ কর। আর আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হ’তে পার।
যাতে তোমরা এ কথা না বলতে পারো যে, আমাদের পূর্ববর্তী দুই সম্প্রদায়ের (ইহূদী ও নাছারা) প্রতি তো কিতাব নাযিল হয়েছিল। কিন্তু সেগুলির শিক্ষা সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ ও উদাসীন ছিলাম।
অথবা তোমরা একথা বলতে না পারো যে, যদি আমাদের উপর কোন কিতাব নাযিল হ’ত, তাহ’লে আমরা তাদের চাইতে অধিক হেদায়াতপ্রাপ্ত হ’তাম। অতঃপর তোমাদের নিকট এসে গেছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে সুস্পষ্ট প্রমাণ, পথনির্দেশ ও অনুগ্রহ। অতঃপর তার চাইতে বড় যালেম আর কে আছে, যে আল্লাহ্র আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে ও তা এড়িয়ে চলে? যারা আমাদের আয়াতসমূহকে এড়িয়ে চলে, সত্বর আমরা তাদেরকে এড়িয়ে চলার মর্মন্তুদ শাস্তি প্রদান করব।
তারা কি কেবল এই অপেক্ষায় রয়েছে যে, তাদের কাছে (মৃত্যুর) ফেরেশতা আসবে কিংবা স্বয়ং তোমার প্রতিপালক আসবেন (অর্থাৎ তাঁর গযব আসবে) অথবা তোমার প্রতিপালকের কোন নিদর্শন আসবে। (মনে রেখ) যেদিন তোমার প্রতিপালকের কোন নিদর্শন এসে যাবে, সেদিন তাদের ঈমান তাদের কোন উপকারে আসবে না, যারা ইতিপূর্বে ঈমান আনেনি অথবা তাদের ঈমান দ্বারা কোন সৎকর্ম করেনি। বলে দাও, তোমরা অপেক্ষায় থাক, আমরাও অপেক্ষায় রইলাম।
নিশ্চয়ই যারা নিজেদের দ্বীনকে (তাওহীদকে) খন্ড-বিখন্ড করেছে এবং নিজেরা বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যাপারটি আল্লাহ্র উপর ন্যস্ত। অতঃপর তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন।
যে ব্যক্তি একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশগুণ নেকী পাবে। আর যে ব্যক্তি একটি মন্দকর্ম করবে, সে তার সম পরিমাণ শাস্তি পাবে। আর তারা অত্যাচারিত হবে না।
বল, আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করেছেন। যা একনিষ্ঠ ইব্রাহীমের বিশুদ্ধ ধর্ম এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
বল, আমার ছালাত ও আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ, সবকিছুই জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্র জন্য।
তাঁর কোন শরীক নেই। আর এ ব্যাপারেই আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই (আমার উম্মতের) প্রথম মুসলিম।
বলে দাও, আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য প্রতিপালকের সন্ধান করব? অথচ তিনিই হ’লেন সবকিছুর প্রতিপালক! প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী। একের (পাপের) বোঝা অন্যে বহন করবে না। অবশেষে তোমাদের প্রতিপালকের নিকটেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তিনি তোমাদের জানিয়ে দিবেন যেসব বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে।
তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে দুনিয়ায় প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন এবং তোমাদের একের উপর অন্যের মর্যাদা উন্নত করেছেন। যাতে তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে পরীক্ষা নিতে পারেন। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক দ্রুত শাস্তিদাতা এবং তিনি অবশ্যই ক্ষমাশীল ও দয়াময়।